সদ্যপ্রাপ্ত
চাকরিতে প্রাধিকার কোটা একটি মায়াবী পর্দা

চাকরিতে প্রাধিকার কোটা একটি মায়াবী পর্দা

ডিসেম্বর ৩০, ২০১৫

বিল্লাল মাহামুদ

বঞ্চনা, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে সুমহান চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জাতি ‘৭১ এ মুক্তি সংগ্রামে নেমেছিল তা আজ অটুট আছে তো? সরকারি চাকরিতে অর্ধেকের বেশি পদ প্রাধিকার কোটায় সংরক্ষণের বিধান ও নিয়োগে অস্বচ্ছতা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠির উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে নিরুৎসাহ এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্যে কতখানি দায়ী তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। প্রাধিকার কোটাধারী তথা অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের জন্যে শুরুতেই ৫৬ শতাংশ পদ সংরক্ষিত রেখে দেয়ায় মেধাবীদের জন্যে রইছে মাত্র ৪৪ শতাংশ। আবার কোটাধারীরা মেধায় পাস করতে পারলে মেধার ৪৪ শতাংশের মধ্যেও ভাগ বসাতে পারছে। সরকারি চাকরিতে প্রাধিকার কোটার এমন বৈষম্যমূলক আধিক্য অন্য কোন দেশে নেই। তাছাড়া কোন কোন দেশে কোটা এতই সীমিত পর্যায়ে যে, কোন পরিবারের একজন কোটা সুবিধায় চাকরি পেলে পরিবারটিকে সচ্ছল ধরে নিয়ে পুনরায় ঐ পরিবারের আর কারো ক্ষেত্রে কোটা প্রযোজ্য হয়না। সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের দোহাই মুষ্টিমেয় কিছু প্রার্থীর জন্যে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রাধিকার কোটা প্রবর্তনের কোন্ কাজে লাগে? অনগ্রসর শ্রেণির জন্যে সুবিধাজনক বিধান হবে, তবে তা এতটা সীমাহীন অযৌক্তিক যেন না হয় যাতে তা সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি- যোগ্যতার ভিত্তিতে নাগরিকদের জন্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের সুযোগের সমতাকে ক্ষুণ্ন করে। জেলা কোটার কাজ কী? সবাই তো কোন না কোন জেলারই নাগরিক। অধিকন্তু এর প্রয়োগেও জটিলতা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মানেই অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী নন, তাদের অনেকে কেবল মেধায়ও চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। কোটা ও মেধা উভয় যোগ্যতা মিলিয়ে তারা যতজন চুড়ান্ত পর্যায়ে আসেন তজ্জন্যে এতগুলি কোটা দরকার হয়না। অতিরিক্ত কোটা রাখার একটা ইঙ্গিত এমনও হতে পারে, কোটানীতিই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানগণকে অধ্যয়ন করে মেধাবী হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করতে পারে। চাহিদার অতিরিক্ত কোটার পদগুলি অব্যবহৃত রাখার চেয়ে কোটা সংকোচন করাই শ্রেয়। যেমন ৩০তম বিসিএসে কোটার জন্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থী না পাওয়ায় ৭৮৪ টি পদ খালি পড়ে রয়েছিল। যেখানে নিয়মিত স্পেশাল বিসিএস দিয়ে প্রাধিকার কোটাধারীদেরকে নেয়া হচ্ছে চাকরিতে, তাহলে আবার প্রতিটি বিসিএসে প্রচুর কোটাধারী প্রার্থী পাওয়া যাবে এ আশায় অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক ৫৬%কোটার বিধান অমূলক ও একটা খামখেয়ালি নীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বৈষম্যমুক্ত একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে অধিকার এবং সুবিচার নিশ্চিৎ করা, অথচ স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও কর্মকমিশনের স্বচ্ছতাটাই আমরা নিশ্চিৎ করতে পেরেছি বলে মনে হয়না। তাই সময়োচিত হবে কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করা এবং মুক্তিযোদ্ধা, নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কোটা সংকোচন করে আনা। ১৯৭৭ সালে পে ও সার্ভিস কমিশনের সকল সদস্য কোটার বিরোধিতা করে অবিলম্বে কোটা বাতিল চেয়েছিলেন। শুধু একজন সদস্য ১৯৮৭ সালের পরবর্তী দশ বছরে ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে কোটা প্রথা একদম বাতিল চেয়েছিলেন। সেই হিসেবে ১৯৯৭ সালের পর আর কোন কোটা থাকার কথা নয়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে এক সরকারী গবেষণা প্রতিবেদনেও কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কই অদ্যাবধি কিছুই হলোনা। অন্যায্য ৫৬ শতাংশ কোটা, প্রয়োজনাতিরিক্ত কোটার পদসংখ্যার জন্যে পর্যাপ্ত প্র্রার্থী না পাওয়া সত্বেও মেধাবী যোগ্য প্রার্থীদেরকে না দিয়ে পদগুলি খালি রেখে দেয়ার হেঁয়ালি নীতি, স্পেশাল বিসিএসে কোটাধারীদের একচেটিয়াত্ব, আবার কখনোবা লবিং এ অনৈতিকভাবে ক্যাডার বিলি করা- এসব মেধাবী জেনারেল ক্যাডারে চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য বঞ্চনা বৈ কি? বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সংক্রান্তে টিআইবি’র গবেষণা (প্রকাশিত ২০০৭) হতে জানা যায় অতিতের বিসিএস পরীক্ষাগুলির প্রায়ই স্পেশাল বিসিএস ছিল। হতে পারে এই স্পেশালের ধারাবাহিকতার ছায়াই কিংবা এই অযৌক্তিক কোটানীতির বঞ্চনা নিজেদের সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরি প্রাপ্তিতে তেমন বাধা হচ্ছেনা বিধায় কোটার প্রতি কর্তাদের এমন উদাসীনতা বা প্রীতি। বিদ্যমান যুক্তিহীন কোটা নীতি প্রসঙ্গে (৪/১১/১৫ প্রথম আলো) সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার যথার্থই বলেছেন, “ভাগের চিড়া চিবিয়ে ফেলে দেব, তবু খেতে দেব না অন্যকে। কিন্তু বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছেনা, এ ভাগটাই অন্যায্য। যেটুকু অব্যবহৃত থাকে, তা বিনা বাক্যে মেধা কোটায় দিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা পিএসসিরই থাকার কথা। ৩৩তম বিসিএসে সরকারের নির্দেশে তা করা হয়েছেও।” কিন্তু এবার ৩৪তম বিসিএসে তা করা হলোনা কেন? দৈনিক পত্রিকার খবরে জানা যায়, ৩৪তম বিসিএস ভাইভার ফলাফলে কোটার অযৌক্তিক নীতি ছাড়াও মেধায় ক্যাডার প্রাপ্তিতেও বঞ্চনার শিকার হয়েছে মেধাবী প্রার্থীরা। বিভিন্ন সূত্রে যে অনিয়মগুলি এবার উঠে আসে- প্রথমত, সরকারী কর্মকমিশনের দুইজন সদস্য কর্তৃক এবার কিছু প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, ভাইভার ফলাফল ঘোষণার আগেই অনৈতিকভাবে ক্যাডার প্রদান করে তা প্রার্থীদেরকে জানিয়ে পিএসসির আইনের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা। তৃতীয়ত, কোটা ও মেধায় পৃথকভাবে ফলাফল প্রকাশের রীতি অনুসরণ করা হয়নি। চতুর্থত, শারীরিকভাবে প্রতিকূল প্রার্থীরা বিসিএস প্রতিযোগিতার চুড়ান্ত পর্যায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্বেও নির্ধারিত ১ শতাংশ কোটার সবাইকে ক্যাডার দেওয়ার বিবেচনাবোধটুকু এবার পিএসসির হয়নি। পঞ্চমত, নন-ক্যাডার তালিকায় থাকা প্রার্থীদের কোন মার্ক মেরিট প্রকাশ না করে নন-ক্যাডার পদগুলি বন্টনে অস্বচ্ছতা। তথ্য উপাত্তের নিরিখে নানাভাবে সমালোচিত এই ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য হাইকোর্টে কয়েকটি রীট দায়ের হয়েছে ঠিকই। কৌতূহল জাগে, ঘটনাবহূল ৩৪তম বিসিএসের ব্যাপারে উঠা অনৈতিকতার অভিযোগ ও দায় খতিয়ে দেখতে অদ্যাবধি কোনো বিভাগীয় তদন্ত কমিটি হয়েছে কি? পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্যগণ বিচারপতি সমমর্যাদার। তাঁরা এতখানি সসম্মানিত, পিএসসির সামনেই তাঁদের কুশপুত্তলিকা দাহ মানায়নি! অবস্থাটা যেন এমন হয়েছে, মায়াবী পর্দা দুলে উঠো, তবু পর্দাখানি ফাঁস না হলেই হয়। ইতিমধ্যে ৩৪তম বিসিএস এর নন-ক্যাডার তালিকা থেকে ৮০ জনকে প্রথম শ্রেণির নন- ক্যাডার পদের জন্যে সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু কোন্ মানদন্ডে নিয়োগের জন্য এই সিলেকশনটি করা হয়েছে? ভাইভার পরে নন-ক্যাডারদের কোনো মেধা তালিকা কি প্রকাশ করেছিল তারা? এই জায়গাটার স্বচ্ছতা কখনো কেউ দাবী করেছে কি? অথচ যাদেরকে বিসিএস ভাইভা পাস করা সত্বেও ক্যাডার স্বল্পতা দেখিয়ে নন-ক্যাডারের জন্যে রাখা হয়েছে তাদের ফলাফল ও রেজি. নাম্বারটা কম্পিউটারে একটু সাজিয়ে দিলেই সিরিয়ালি মেধা তালিকাটা হয়ে যায়। তা তারা করছেনা, কোন কারণে কার স্বার্থে? একটা সুদূর প্রসারী অযৌক্তিকতা লক্ষ্যণীয়, যখন নন-ক্যাডার তালিকার প্রার্থীরা নন-ক্যাডারে নিয়োগের জন্যে আবেদন জমা দেয় তখন তাদের কাছে ফরমে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ সনদ চাওয়া হয়। প্রশ্ন হল, নন- ক্যাডারদের কি ক্যাডারদের থেকেও অধিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা-মেধার ঝুলিধারী হতে হবে? উপরোক্ত বয়ানের পর পিএসসি’র প্রতিটি সার্কুলারের পাতায় পাতায় থাকা অমর বাণীটি পাঠ করছি- “পড়াশুনা ও জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করুন; চাকরির ক্ষেত্রে কোনরূপ তদবির প্রার্থীর অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে।” যদিও সাথে এবার যোগ হল ৩৪তম বিসিএস এর জনৈক পুলিশ ক্যাডারের বাণীটি (কালের কন্ঠ, ৩১অক্টোবর)- “কোন মাধ্যম না ধরে সরাসরি পিএসসি সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করলে ‘কাজ’ হয়”। কিন্তু এমন দ্বান্দ্বিকতা তো আমাদের কাম্য ছিলনা। সর্বোপরি প্রাধিকার কোটা সমৃদ্ধকরণে ও প্রয়োগে সরকারের যে আবেগ-দৃষ্টিভঙ্গী তাতে মনে হয়, এ কোটার মায়াবী পর্দা বড়ই দুর্ভেদ্য। এভাবেই প্রাধিকার কোটার অন্যায্য আধিক্য, পিএসসির উদাসীনতা, এবং পত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকলে নিয়োগে অনৈতিকতা ও অস্বচ্ছতা যোগ্য প্রার্থীদেরকে এবার অবমূল্যায়নই করছে।

 

লেখক- আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

About বিডিএলএন রিপোর্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*