Home » ব্লগ » পরীক্ষা ছাড়া সনদের দাবি আপীল বিভাগের রায়ের আলোকে বিশ্লেষণ
পরীক্ষা ছাড়া সনদের দাবি

পরীক্ষা ছাড়া সনদের দাবি আপীল বিভাগের রায়ের আলোকে বিশ্লেষণ

0

শিক্ষানবিশ (Apprentice or Apprenticelawyer)-দের আন্দোলন হওয়া উচিত বার কাউন্সিল যেন প্রতিবছর পরিক্ষার ব্যবস্থা করে। পরিক্ষা ছাড়া সনদ দেওয়ার দাবী করা একদম অযৌক্তিক। এমনিতেই এই পেশার মান কমতির দিকে। আমাদের সবার উচিত এর গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া।

তবে, শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের ক্ষোভের জায়গাটা যৌক্তিক। যেখানে রাষ্ট্র তার শিক্ষিত নাগরিকদের জীবন ও জীবীকার ব্যবস্থা করে দিতে ব্যর্থ সেখানে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা নিজের ঘাটের টাকা খরচ করে, রোদে পুড়ে, নানান ত্যাগ তিতিক্ষা করে নিজের পায়ে দাড়াতে চাচ্ছে সেখানে রাষ্ট্র বা বার কাউন্সিল বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনা। সংবিধানের ১৫ (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের যুক্তিসঙ্গত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের একটি গুরু দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বলা হয়েছিল, বিশ্বে শিক্ষিত বেকারের সর্বোচ্চ হার বাংলাদেশে। প্রতি ১০০ জন গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা লোকের মধ্যে ৪৭ জন বেকার। কি ভয়াবহ একটা অবস্থা! করোনা পরিস্থিতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। কিন্তু পরিক্ষা ছাড়া সনদ দেওয়া সেই ক্ষোভের সঠিক ঔষধ হতে পারেনা। পরিক্ষা হচ্ছে এমন একটি ছাকুনি যার মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অযোগ্য লোকেরা বাদ পড়ে এবং অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোকেরা আমাদের প্রফেশনে আসার সুযোগ পায়।

তাছাড়া, আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা ও তালিকাভুক্তিকরণের বিষয়টি ১৯৭২ সালের দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাক্টিশনার্স এন্ড বার কাউন্সিল অর্ডার এ বলা আছে। ৫০ বছর আগের আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পুর্ণ ভিন্ন। এমতাবস্থায় বর্তমান আইনটি সংশোধন ও পরিবর্তন অত্যাবশ্যক । এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ‘Professor Syed Ali Naki and others v Bangladesh and others’ এবং ‘Bangladesh Bar Council and others v A.K.M. Fazlul Kamir and others’ মামলায় আইন শিক্ষার পরিবর্তন, বার কাউন্সিলের পুণর্গঠন, আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের বিষয়ে কয়েকটি নির্দেশনা প্রদান করেন কিন্তু অদ্যবধি তা পালন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য দিকনির্দেশনা সমূহ আমি আবার উল্লেখ করছিঃ

১) ২ বছরের এল.এল.বি. (পাশ) কোর্স ও সান্ধকালীন কোর্স সমুহ বন্ধ করে দেওয়া।

নোটঃ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশ করলেও অদ্যবধি কলেজগুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২ বছরের পাশ কোর্স বন্ধ করে ৪ বছরের গ্রাজুয়েশন কোর্স চালু হওয়ার কথা থাকলেও কাদের স্বার্থে এই উদ্যোগ থেমে আছে আমরা ঠিক জানিনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই কলেজসমুহের প্রিন্সিপাল বা প্রতিষ্ঠাতা হয়ে থাকেন সিনিয়র আইনজীবী অথবা রাজনৈতিক নেতাগণ। উনাদের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে ‘কেউ বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাধতে পারবেন কিনা’ তা ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। অন্যদিকে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ২ বছরের পাশ কোর্স হতে পাশ করা। সান্ধ্যকালীন ছাত্রদের বড় অংশ চাকরীজীবী অথবা অন্য প্রফেশনে যারা ভাল সুবিধা করতে পারছেন না তারাই সান্ধ্যকালীন কলেজগুলো হতে নামমাত্র সার্টিফিকেট নিয়ে আইনজীবী হতে চান। যা আইন শিক্ষা ও পেশার মুল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

২) আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের ক্ষেত্রে বয়সের একটি সীমা বেধে দেওয়া।

নোটঃ এ বিষয়ে অদ্যবধি কোন নোটিশ বার কাউন্সিল হতে প্রকাশ পায়নি। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ হওয়া স্বত্ত্বেও বার কাউন্সিল উক্ত বিষয়ে কোন দৃশ্যমান কার্যক্রম হাতে নেননি। উপরন্তু; আন্দোলনরত শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের নেতৃত্বের একটি বড় অংশের বয়স ৪০ এর কাছাকাছি বা তার বেশি। এই রায়ের পর আন্দোলনে তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কোন নৈতিক অধিকার থাকেনা।

৩) ইউনিভার্সিটি’তে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৫০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

নোটঃ এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং বার কাউন্সিল কঠোর পদক্ষেপ নিলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ৫০ এর বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছিলেন। পরবর্তীতে, হাইকোর্ট বিভাগ জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীস্মুহের পরিক্ষা দেওয়ার সুযোগ প্রদান করেন।

৪) প্রতি বছর আইনজীবী তালিকাভুক্তকরণের পরিক্ষার ব্যবস্থা করা।

নোটঃ প্রতি বছর একটি পরিক্ষার ব্যবস্থা করার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও বার কাউন্সিল এখানে চরমভাবে ব্যর্থ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি পরিক্ষা সম্পন্ন করতে ২ থেকে ৩ বছর সময় চলে যায়। যার কারণে অনেকে এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী যারা সমাজকে ভাল কিছু দিতে পারতেন তারা অন্য পেশায় চলে যান। অনেকের ভাগ্য ও জীবীকা উক্ত পরিক্ষার সাথে জড়িত থাকলেও বার কাউন্সিল প্রতি বছর একটি পরিক্ষা সম্পন্ন করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন। ‘Bangladesh Bar Council and Others v A.K.M. Fazlul Kamir and Others’ মামলাতেও আপিল বিভাগ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন, “…………… দেখা যায় যে, বার কাউন্সিল তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেনা এবং আইনজীবি নিয়োগের এনরোলমেন্ট পরিক্ষাও প্রতি বছর নিতে পারছেনা” । এই ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে আপিল বিভাগ প্রতি বছর পরিক্ষা সম্পন্ন করার জন্য বার কাউন্সিলকে নির্দেশনা প্রদান করেন।

এমতাবস্থায়, শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের আন্দোলন হওয়া উচিত এই ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে প্রতি বছর পরিক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামুলক করার জন্য আন্দোলন করা। তা না করে লিখিত পরিক্ষা ছাড়া সনদ প্রদানের আন্দোলন আমাদের পেশা’র অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং পেশার মানকে চরমভাবে ব্যহত করবে। উপরন্তু; বর্তমান পরিক্ষা কাঠামো অনেকটা মুখস্ত নির্ভর হওয়ায় এর মাধ্যমে প্রকৃত মেধা যাচাই অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব না। অন্যদিকে, একজন আইনজীবী কে শুধুমাত্র ৭ টি বিষয়ের মাধ্যমে যাচাই না করে সংবিধান, ভূমি আইন, পারিবারিক আইন সমুহ অবশ্যই পরিক্ষার সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং লিখিত পরিক্ষার নম্বর ১০০ হতে ১০০০ নম্বরে পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবী। এ বিষয়ে অনেক আইনবোদ্ধারাও পুর্বে দাবী জানিয়েছিলেন।

লেখকঃ
মোঃ মনির হোসেন
আইনজীবী
ঢাকা জজ কোর্ট।
monir12890@gmail.com

Bookmark(0)

Check Also

ওসি প্রদীপ কুমার গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় কক্সবাজারের টেকনাফ থানার প্রত্যাহারকৃত …