Home » মতামত » বন্ধ করা হোক শিশুদের দিয়ে সকল অনৈতিক বিজ্ঞাপন

বন্ধ করা হোক শিশুদের দিয়ে সকল অনৈতিক বিজ্ঞাপন

বর্তমানে টেলিভিশন ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের বেশির ভাগই অনৈতিকতার দোষে দুষ্ট। যার প্রভাব এসে পড়েছে শিশুদের উপরেও। ইদানীং বিভিন্ন মিডিয়ায় ও বিলবোর্ডে শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। কিছু বিজ্ঞাপন চিত্রে শিশুদের অনৈতিক ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা আমাদের দেশে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজের শিশুদের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। কারণ বড়দের কাছ থেকে দেখে শিশুরা যেমন শেখে তেমন বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখেও শিশুরা তা অনুকরণ করে। যেহেতু বিজ্ঞাপন প্রচারে মিডিয়া কিংবা বিলবোর্ড বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় মাধ্যম সে কারণেই শিশুরা এইসব মাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে বেশি। বিশেষ করে যে সব বিজ্ঞাপনে শিশুদের মডেল হিসেবে ব্যাবহার করা হয় সেই সব বিজ্ঞাপন তাদের মনের উপর প্রভাব ফেলে। নিচে বর্তমানে বিভিন্ন টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া ও বিলবোর্ডে প্রচারিত হচ্ছে এমন কিছু বিজ্ঞাপনের নমুনা তুলে ধরা হলঃ

কেস স্টাডি-১

বোন তাঁর ছোট ভাইয়ের পিছে ছুটছে চোর চোর বলে চিৎকার করে। তা দেখে তাঁদের বাবা-মাসহ ঐ পরিবারের সবাই বোনকে অনুসরণ করছে চোর ধরতে। চোর ধরা পড়লে সবাই দেখে তাঁদের পরিবারেরই এক শিশু সদস্যই কমলা চুরি করেছে। ছেলেটির দাদী তাঁকে কান ধরে উঠবস করাল। সংবাদপত্রের ভার্সনে বিজ্ঞাপনটিতে এক কন্যা শিশুকে চোর হিসেবে দেখানো হয়েছে বুকের উপর একটা কাগজে বড় করে কমলা চোর লিখে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোন চোর কিংবা সন্ত্রাসী ধরা পড়লে তাঁদের মিডিয়ার সামনে যেভাবে উপস্থাপন করে কাগজে লেবেল এঁটে বুকের উপর ঝুলিয়ে রাখা হয় ঠিক সেই ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে মেয়েটিকে। কোমলমতি শিশুর অভিনয় দিয়ে চোরের চরিত্রকে এভাবেই ফুটিয়ে তুলা হয়েছে বিজ্ঞাপনটিতে। এটি আমাদের দেশে সাম্প্রতি মিডিয়াতে বহুল প্রচারিত একটি কোম্পানির পানীয় দ্রব্যের বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন দেখার পূর্বে চুরি সম্পর্কে যে শিশুর মনে তেমন কোন ধারণা ছিলনা সে শিশু চুরি শিখবে। সংশ্লিষ্ট অপরাধ সম্পর্কে তার আগ্রহ জন্মাবে।

কেস স্টাডি-২

ছোট ছোট ছেলে বাড়ীর আঙ্গিনায় ক্রিকেট খেলছে। এক জনের ছুঁড়ে মারা বল গিয়ে নিকটবর্তী ঘরের জানলার কাচ ভেঙ্গে দিল। বাড়ির গৃহিণী জানালার কাঁচ কে ভাঙল, কে ভাঙল বলে চিৎকার করতে করতে জানালার দিয়ে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখেন এ আর কেউ না। তাঁর নিজের ছোট্ট ছেলেটি জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছে। তখন তিনি সাথে সাথে চিৎকার বন্ধ করে উল্টো নিজের ছেলেকে ভাল খেলয়ার হতে কাঁচ ভাঙ্গার জন্য আরও উৎসাহিত করতে লাগলেন আর অন্যান্য ছেলেরা হতভম্ব হয়ে তা দেখছে। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে আপন জনের জন্য কোন কিছুতে নিষেধ নেই। বিজ্ঞাপনটি যে উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছে সেই উদ্দেশ্যের সাথে শিশুদের দিয়ে এমন দৃশ্য অবতারণা করার যৌক্তিকতা কতটুকু? এই বিজ্ঞাপনটি অন্য কোন থিম দিয়েও তো বানানো যেত। এখানে বিজ্ঞাপনটি তাঁদের পণ্য বা সেবার উদ্দেশ্যটি ব্যক্ত করছে কিন্তু সাধারণ শিশুরা এখান থেকে কি অনুসরণ করবে তা ভেবে দেখা হয়নি? কোমলমতি শিশুরা শুরু থেকেই শিখবে ভাল হোক আর খারাপ হোক আপন জনের বেলায় সব অপরাধ কিংবা নেতিবাচক কাজ মাফ। পারলে এর জন্য সে আরও বাহবা পাবার যোগ্য।

 

কেস স্টাডি-৩

ছেলে বিদ্যুৎ বিলের টাকা না দিয়ে মোবাইল কিনে ফেলেছে। তাই বাবা জেনে রেগে ফায়ার। বিজ্ঞাপনে পরামর্শ হল একটি নির্দিষ্ট চকলেট খাও। আর চাপার জোর বাড়াও কিভাবে বাবাকে মিথ্যা বলে পার পাওয়া যাবে এই অবস্থা থেকে। এটি বিলবোর্ডে প্রদর্শিত আমাদের দেশের একটি বিখ্যাত ফুড কোম্পানির চকলেটের বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন দেখে কোমলমতি শিশুরা কি বার্তা পাচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। শিশুরা তখন অভিভাবকের শাস্তি এড়ানোর জন্য মিথ্যা বলবে। আর একটা শিশুর জন্য মিথ্যা বলাটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে যদি বাবা-মা বিষয়টি ঠিকভাবে হ্যান্ডল করতে না পারেন। তখন শিশুটি শুধু মিথ্যাই বলবে না বরং আরো বড় ধরণের অপরাধ করতে পারে।

 

কেস স্টাডি-৪

বাবার পকেট থেকে ছেলে টাকা চুরি করেছে। সেই টাকার পরিমাণও অনেক বেশি কিন্তু বিষয়টি বিজ্ঞাপনে এমন ভাবে দেখানো যে তা চুরি না বরং সেই টাকা সকলের সামনে চাওয়া হয়েছে। এখানে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরির বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যার ফলে এ কাজ আর অপরাধমূলক কাজ বলে মনে হয়নি। এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেখে কোমলমতি শিশুরা বাবার পকেট থেকে প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে টাকা চুরি করতে শিখবে। এখানে চুরি করাকে ক্রিয়েটিভ কাজ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

উপরের কেসগুলো থেকে বুঝা যায় মুনাফার লোভে কতটা নিচে নামলে এমন অনৈতিকভাবে শিশু ও কম বয়স্ক কিশোর কিশোরীদের দিয়ে কিছু বিজ্ঞাপন বানানো হচ্ছে! আর সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন টিভি চ্যানাল, পত্রিকা ও বিলবোর্ডে তা ফলাও করে প্রচার করছে। এসব বিজ্ঞাপন যে শিশুদের মনকে আকৃষ্ট করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ফলে কোমলমতি শিশুরা বিভিন্ন অপরাধমূলক ও নেতিবাচক কাজে উৎসাহিত হবে। যে অপরাধ ও অনৈতিক বিষয়ে তাঁদের কোন ধারণা ছিল না সেই অপরাধ সম্পর্কে তাঁরা অবগত হবে। নিজেদের খারাপ কাজগুলোকে ভাল বলে মনে করতে শুরু করবে।

শিশুদের মন নমনীয়। শুরু থেকে তারা কোন খারাপ বা নেতিবাচক কিছু শিখলে সহজে তা শূদ্রাতে পারে না। বিশেষ করে তা যদি টিভি, পত্রিকা ও বিলবোর্ডে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে হয় তবে তো কথাই নেই। সে বুঝতে চায়বে না যে সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপনে যা দেখানো হচ্ছে তা চর্চা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে বিভিন্ন মিডিয়াতে শিশুদের পুঁজি করে বিজ্ঞাপন দেওয়াও বন্ধ হচ্ছে না। কিছু দিন আগে সরকার “জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৩” নামে একটি নীতিমালা খসড়া আকারে প্রকাশ করে। এই নীতিমালায় শিশুদের বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে ব্যবহারে করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গুঁড়া দুধের বিজ্ঞাপনে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে প্রায় সকল গুঁড়া দুধের বিজ্ঞাপনে ৬ মাস থেকে শুরু করে সকল বয়সী শিশুদের দিয়ে মিথ্যা ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।

ইংল্যান্ডের এক দুধ কোম্পানি দুধের বিজ্ঞাপন তৈরি করে। দুধটি শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি বলে দেখানো হয় ওই বিজ্ঞাপনে। প্রচার করা হয় এই দুধ শিশুর হাড় গঠনে ও শারীরিক বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে সহায়ক। বিজ্ঞাপনটি দেখে সেদেশের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এর নমুনা পরীক্ষা করেন। কিন্তু পরীক্ষায় শিশুদের হাড় গঠন ও শারীরিক বৃদ্ধিতে সহায়ক এমন কোন উপাদান পাওয়া যায় না। পরে পরীক্ষাকারী বিশেষজ্ঞদল ওই কোম্পানির নামে মামলা দায়ের করেন।

অধিকাংশ বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য থাকে তাঁদের সেবা বা পণ্যটি বিক্রি করা। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে এমন কোন বিজ্ঞাপন না বানানো যাতে করে সেই বিজ্ঞাপন কমলমতি শিশুদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে অথবা কোন শিশু ঐসব বিজ্ঞাপন দেখে বা শুনে অপরাধমূলক কিংবা কোন নেতিবাচক কাজ করতে উৎসাহিত হয়।

এই ধরণের প্রচারিত বিজ্ঞাপনে কমলমতি শিশুদের চরিত্র হনন ও অপরাধবোধে উদ্ধুত্তকরণের কারণে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত শিশু অধিকার সনদ লঙ্গন হয়েছে বলে মনে করেন নাগরিক সমাজ। অপর দিকে প্রচলিত আইন দিয়েও সব কিছুর বিচার করা সম্ভব নয়। নৈতিকতার স্বার্থেও এমন ধরণের বিজ্ঞাপন না বানানোর জন্য বিজ্ঞাপন নির্মাতা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ ব্যবসা পরিচালনায় নৈতিকতা মেনে চলা সততার পরিচায়ক।

যাহোক, বিজ্ঞাপনে এমন কিছু প্রচার করা উচিত নয় যা শিশুদের প্রভাবিত করে তাদের শারীরিক ও মানসিক গঠন ব্যাহত করে। শিশুদের জন্য তৈরী করা বিজ্ঞাপনের দৃশ্য যদি নেতিবাচক হয় আর তারা যদি বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ করে থাকে তবে তা ভবিষ্যতে কখনো ভাল ফল দেবে না।

লেখকঃ মোঃ জাহিদ হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, রিসার্চ অর্গানাইজেশন ফর লিগাল এওয়ারনেস বাংলাদেশ (রোলা বাংলাদেশ) zahidlawcu@gmail.com  Call- 01828 72 79 54

Share and Enjoy !

0Shares
0 0 0

Check Also

শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের দাবি এবং একটি বিকল্প ভাবনা”

শিক্ষানবিশ আইনজীবী (Apprentice Lawyer or Apprentice)-দের চলমান আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌছানোর আগে একটু পেছনে …

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.