রবিবার , ২০ মে ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিবৃন্দের সংক্ষিপ্ত জীবনী (পর্ব-২)

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিবৃন্দের সংক্ষিপ্ত জীবনী (পর্ব-২)

এপ্রিল ৪, ২০১৮

সৈয়দ এ. বি. মাহমুদ হোসেন: বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বিচারপতি

জার্মান নাট্যকার ব্রেখট বিশ শতকের প্রথমার্ধে সৎ মানুষের খোঁজে ব্যাপৃত ছিলেন। আমরাও সন্ধানরত। এবং যথার্থ বলতে, এ অনুসন্ধান লাভ সহজ নয়, বরং দুর্লভ। জনঅরণ্যের মধ্যে সেই দুর্লভ মানুষকে আমি খুঁজে পেয়েছি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের মধ্যে যিতি শুধু সৎ নয়, একজন সত্যিকার মানুষ। মানবপ্রত্যয় ও মানব কল্যাণে তিনি এক নিবেদিতপ্রাণ।

বিচারপতি মাহমুদ হোসেনের জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্ম জীবনের সূচনা। ১৯৩৭ থেকে দারুল উলুম আহসানিয়া সিনিয়র মাদ্রায় অবৈতনিক সুপার রূপে কর্মজীবন শুরু করে মানবজীবনে শিক্ষাদান তার ব্রত হয়ে দাঁড়ায়। আইনজীবী ও বিচারক রূপে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন। সত্যিকার অর্থে তিনি মূলত প্রধানত একজন শিক্ষাব্রতী। তিনি ওকালতি শুরু করেন প্রথমে ঢাকা জেলা কোর্টে (১৯৪০), এরপর নিজ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) সদর হবিগঞ্জে (১৯৪৩-৪৮)। হবিগঞ্জে এসে তিনি ওকালতি পেশার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। সিলেট রেফারেন্ডামের সময় তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে। দেশসেবায় তিনি একজন দায়িত্ববান ও কর্তব্যনিষ্ঠ নাগরিকের পরিচয় দিয়েছেন। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তার ‘রিপাবলিকে’ যে ধরনের সুনাগরিকের কথা বলেছেন, তাকেও অনুরূপ সুনাগরিক বলা যায়।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি গণপরিষদের সদস্য হলেন। গণপরিষদে তিনি স্বীয় মাতৃভাষা বাংলা সম্পর্কে মূল্যবান ভূমিকা ও অবদান রেখেছেন। বাংলা ভাষার সপক্ষে তিনি গণপরিষদের যে জোরালো বক্তব্য রাখেন, এর বাংলা তরজমা করলে এই দাঁড়ায় : ‘রসুলে করিম (সা.) শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন এবং কোনো ভাষা শিক্ষার ওপর বিধিনিষেধ প্রয়োগ করেননি, বরং তিনি উৎসাহিত করেছেন; কেননা লোকের কাছে তা অতি সহজে আবেদন জানাবে। অথচ এখানে বাংলা ভাষাকে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে— যেন এ ভাষা শরাফতের নয়। লোককে তার নিজের (মাতৃ) ভাষা দিয়ে বোঝাতে হয় এবং সাধারণ মানুষ নিজের (মাতৃ) ভাষাই পছন্দ করে থাকে। কিন্তু এখানে বাংলা ভাষার প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই, বরং এর প্রতি একটা ঘৃণাব্যঞ্জক দৃষ্টি রয়েছে। রাষ্ট্র কর্তৃক আল্লামা ইকবালের রচনাবলি বাংলা ভাষায় অনূদিত হচ্ছে না, অথচ ইংরেজি ও আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে। রসুলে করিমের (সা.) জীবনচরিত লোকের মাতৃভাষায় রচিত হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে অবস্থা ভিন্ন রূপ।

গণপরিষদে বাংলা ভাষার সপক্ষে বক্তব্য রাখার জন্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করেছেন। অথচ আফসোসের বিষয়, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আদৌ কোনো স্বীকৃতি লাভ করেননি। এ জন্য ভাষা আন্দোলন নিয়ে যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের সবার কাছে অনুরোধ, ইতিহাসের খাতিরে যেন গণপরিষদে বাংলা ভাষার সপক্ষে সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের যে ভূমিকা তা যেন যথাযথভাবে উল্লিখিত হয়। ইতিহাসে সত্যের অপলাপ ঘটা উচিত নয়।

সৈয়দ মাহমুদ হোসেন কর্মজীবনে প্রধানত আইনকে মাধ্যমরূপে অবলম্বন করেছেন। ১৯৪০ সালে আইন পেশায় নিয়োজিত হয়ে সততা, নিষ্ঠা, এষণা ও একাগ্রতার ফলে তিনি ক্রমাগত আইনের জগতে সম্মুখপানে এগিয়ে গেছেন। তিনি ১৯৪৩-৪৮ সালে হবিগঞ্জে অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবী থাকার পর ১৯৪৮ সালে ঢাকা হাই কোর্ট বারে যোগদান করেন। এরপর (তৎকালীন) পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টের অ্যার্টনি হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৫৮ সালের মে মাসে (তৎকালীন) পূর্ব পাকিস্তান হাই কোর্টে সহকারী সরকারি আইনজীবী, এরপর ১৯৬২-৬৫ একই কোর্টে সিনিয়র সরকারি আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালে কিছু সময়ের জন্য (তৎকালীন) পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে ১৯৭৮ অবধি এ দায়িত্ব পালন করেন। বিচারপতি ও প্রধান বিচারপতি রূপে তার ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য। ৩৮ বছর ধরে আইনের জগতে বিচরণ করে তিনি আইনের প্রতি যে আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন তা আদর্শস্বরূপ ও অনুকরণীয়। বিচারপতি থাকাকালে তিনি ‘মাস্টার সার্ভেন্ট’ সংক্রান্ত যে রায় দেন তা উপমহাদেশে, বিশেষত ভারতে এখনো অনুসৃত থাকে। ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ তিনি সমুন্নত করেছেন। শুধু তাই নয়, বিচার ব্যবস্থাকে তিনি সংহত করার প্রয়াস পেয়েছেন। জাতিসংঘ ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান বিচারপতি রূপে তিনি বক্তব্য রাখেন— ‘আইনের অর্থ দৃঢ়তা এবং এই দৃঢ়তা সমাজ কাঠামোর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। আইন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। নীতিগত দিক হইতে আইন স্থিতিশীল এবং ইচ্ছাশক্তির দিক হইতে গতিশীল। যতদিন মানুষ তার অস্তিত্ব অনুভব করবে ততদিন অবশ্যই আইন প্রতিপালিত হবে। কোনো মানবিক আইন এর পরিপন্থী কাজ করে টিকে থাকতে পারে না। আমরা আমাদের বিশ্বস্ততা, একাগ্র গবেষণা ও গভীর সাধনার মাধ্যমে এই আইনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জনগণের কল্যাণের জন্য না হলে কোনো আইনের প্রয়োগ বা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নহে’।

উপরিউক্ত ভাষণে তিনি বিশ্ব নাগরিকত্বের কথাও উচ্চারণ করেন : ‘জাতিগত, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সীমারেখা সত্ত্বেও সকল মানুষের জন্য সমঅধিকারের ভিত্তিতে বিশ্ব নাগরিকত্বের বিধান থাকা উচিত’। এবং এক্ষেত্রে জাতিসংঘ যেন সমুচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, এই সুপারিশ তিনি করেন। বাঙালিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের পর সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বিশ্বমৈত্রীর কথা বলেছেন, বাংলার ইতিহাসে এ কথা স্বর্ণাক্ষারে লেখা থাকবে।

বিচারপতি মাহমুদ হোসেন একজন মানববাদী,  তাই মানবতার সেবায় তিনি আত্মনিবেদন করেছেন।

হার্ট ফাউন্ডেশন, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এজেড (বৃদ্ধদের জন্য সংগঠন) এসব মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন।  এ অমর আত্মার প্রতি আমার অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং এ আদর্শ পুরুষ উত্তরকালে অনুকরণীয় হবেন, এই আমার প্রত্যাশা ও প্রত্যয়।

লেখকঃ অধ্যাপক মো. মোবাশ্বের আলী

সম্পাদনায়ঃ এ বি এম শাহজাহান আকন্দ (মাসুম), আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*