বুধবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত
কি অবস্থায় আছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোমলমতি শিশুরা??

কি অবস্থায় আছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোমলমতি শিশুরা??

October 10, 2013

অতনু সাগরঃ

প্রতিদিনের মত আজও আকাশে জেগে উঠল রক্তিম সূর্য্য। সোনালি সকাল দিয়ে শুরু হল আরেকটি নতুন দিন। ধীরে ধীরে হাঁক ডাঁক বাড়তে থাকল চারপাশের। দিন যতই বাড়ে, জনমানুষের ব্যস্ততা ততই চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়তে থাকে।

জোড়াতালি দেওয়া সব টিন ও বেড়া দেওয়া বেশ কয়েকটি বাড়ী নিয়ে এক বস্তি। বাঁশের বেড়া দেওয়া, টিনের চালাওয়ালা এক ঘরের দরজা খুলে বের হলো রাহিম। ধীর পায়ে চলল পত্রিকা অফিসের দিকে। তার বয়স বড়জোড় দশ কি বারো। এতটুকুন মুখ। আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেছে। অনেক কথা শুনতে হবে। হয়তোবা মারও খেতে হতে পারে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় তার চোখে পড়ে রিক্সায় করে তার মত বয়সী কত ছেলে মেয়ে বাবা-মার সাথে করে স্কুলে যাচ্ছে। কত আদর তাদের। খুব ইচ্ছে করে যদি কাজ না করা লাগত? যদি এইসব সাহেবদের ছেলে-মেয়েদের মত করে ফিটফাঁট হয়ে স্কুলে যাওয়া যেত। পরমুহুর্তে তার চোখে ভেসে ওঠে মায়ের অসুস্থ ও ক্ষুধার্ত মুখ। তার বাবা নেই। গাড়ী চালাতে গিয়ে বছরখানেক আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। সেই থেকে তার মা অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ করত। একদিন কি যেন এক অসুখ ধরল তার মাকে। বাঁ পা টা অবশ হয়ে গেল। চারিদিকে অন্ধকার দেখতে লাগল সে। সেই বস্তিরই এক লোক তাকে একটা কাজ দিল। পত্রিকা বিলি করার কাজ। সামান্য বেতনে। বিনিময়ে সেই লোকটিকে তার বেতনের থেকে মাসে মাসে ৫০০টাকা করে দিতে হবে। সেই থেকে শুরু।

শুধু রাহিম একাই নয়। তার মত হাজার হাজার রাহিমেরা এই বাংলার বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যারা খাদ্যের বিনিময়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে বাধ্য হচ্ছে। বিনিময়ে পাচ্ছে শুধু বঞ্চনা, গঞ্জনা, আর অমানবিক অত্যাচার। কিন্তু কেন এই অমানবিক প্রহসন?

স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হয়ে গেলো। আজো আমরা পুরোপুরি পারিনি আমাদের সমাজকে দারিদ্রতার হাত থেকে মুক্ত করতে। এক্ষেত্রে আমার একটা কথা খুব মনে পড়ছে। তা হলঃ

“স্বাধীনতা লাভ করা যেমন কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমনি কঠিন। আজ আমাদের অস্ত্রের সংগ্রাম শেষ হয়েছে। এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম কে দেশ গড়ার সংগ্রামে রূপান্তরিত করতে হবে। মুক্তির সংগ্রামের চেয়েও দেশ গড়ার সংগ্রাম কঠিন। তাই দেশ গড়ার কাজে আমাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করতে হবে।“ -শেখ মুজিবর রহমান।

জাতির পিতার এমন উদাত্ত আহ্বানের পর আজো আমরা আমাদের দেশের ভবিষ্যত গড়ার হাতিয়ার শিশুদের মেধা বিকাশের জন্য মুক্ত পরিবেশ তৈরী করতে পারিনি। এটা সম্পুর্ণ আমাদের ব্যর্থতা। কারন এখনো পত্র পত্রিকায় আমাদের চোখে পড়ে অমানুষিক বেশ কিছু সংবাদ। গত কয়েকদিন আগেই আমরা ব্যথিত হয়েছিলাম ঢাকার বনানীর এক গৃহকর্মীকে মেরে খুন্তির ছ্যাকা দেবার পর মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলে যাবার ঘটনার কথা জেনে। এমন আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে, এবং এখনো ঘটছে। কারা এসব ঘটাচ্ছে? তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তারা কি আসলেই উপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছে? নাকি অর্থের জোরে আইনের চোখে আঙ্গুলী দেখিয়ে মুক্ত হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছে তা আমাদের খতিয়ে দেখবার দাবী রাখে।

আজ আমাদের শিশুরা নানা ধরনের কষ্টসাধ্য কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। কিন্ত এমন পরিশ্রমের পরও তারা নুন্যতম বেতনের ক্ষেত্রেও বঞ্চিত হচ্ছে। আমরাই তাদেরকে দিয়ে কষ্টসাধ্য কাজ করাচ্ছি, আবার আমরাই তাদেরকে বেতন কম দিচ্ছি। কিন্ত কেন? নিজেকে প্রশ্ন করেছি কখনো?

আসুন আমরা একটু ঘুরে ঘুরে দেখি, এই সোনার বাংলাদেশের শিশুরা কি কি কাজ সাধারনত করে থাকেঃ

১) শহরাঞ্চলে এদের দেখা মেলে বেশি। বিভিন্ন স্টপিজে, রেল ষ্টেশনে, বা যেখানে লোক সমাগম বেশি হয় এমন জায়গায় এরা ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঢাকা শহরের শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালী, ধানমন্ডি ও গুলশান লেকসহ বিভিন্ন পার্কে এদের বেশি দেখা যায়।

২)কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিনে এদের বেশি দেখতে পাওয়া যায়। এদের বাবা মা অধিকাংশই জেলেপাড়ায় বাস করে। বর্তমান সভ্যতা হতে বেশ দূরে এদের বসবাস।

৩) সাভারের ইটভাটাসহ অন্যান্য ইটভাটায় এদের দেখা যায়। শিশুদের মানসিক মেধা বিকাশের অন্যতম অন্তরায় এমন কাজ।

৪) ঢাকা শহরের অলিগলিতে থাকা বিভিন্ন হোটেল সহ দেশের অনেক জায়গায় এমন শিশু শ্রমিক পাওয়া যায়।

৫) ইচ্ছেমত বকা দিয়ে এমনকি গায়ে হাত তুলে হলেও এদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেওয়া হয়। ফলে অনেকটা যান্ত্রিকের মত হয়ে যায় এরা।

৬) শুধু কাঠই নয়, কাঠ ছাড়াও বিভিন্ন দোকানে শিশুদের ব্যবহার করা হয় সেলসম্যান হিসেবে। তবে নামে সেলসম্যান হলেও মুল্য অনেক কম। একটু ভুল হলেই রাম পিটুনি জোটে মালিকের কাছ থেকে।

৭) এটি আমাদের চোখে অহরহ পড়ছে। এরা শুধু মালিকই নয়, আমাদের মত যাত্রীদের হাতেও অনেক মার খায়। ভাড়া নিয়ে একটু গোলমাল হলেই এদের কপালে জোটে অর্ধচন্দ্র ও পিটুনি।

৮) এদের দেখা মেলে বিভিন্ন পথে ঘাটে অথবা বাস স্ট্যান্ড বা রেল স্টেশনে। কেউবা আমাদের ভারী ভারী লাগেজ বয়ে বেড়ায়, আবার কেউ কেউ আমাদের পিপাসা মেটায়।

এসব তো গেলো বৈধ কাজের কথা যেগুলোতে শিশুদের অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এবার অন্য কথায় আসি। শুধু এসব কাজই নয় মেয়ে শিশুদের সম্পুর্ন অমানবিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন হোটেলে অথবা যৌনপল্লিতে যৌনকর্মী হিসেবে। এটা যে কি পরিমান কদাকার ও মানবতার নিস্পৃহ কান্না তা বিকৃতরুচির মানুষদের পক্ষে অনুধাবন করাও সম্ভব নয়। যারা এসব শিশুদের ব্যবহার করছে, তাদের মাঝে এক শ্রেনীর লোক আছে। যারা দেশের বিভিন্ন স্থান হতে কাজ দেবার নাম করে এসব মেয়েদের জোগাড় করে এনে নানা জায়গায় বিক্রি করে ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ বা ২ লাখ টাকার বিনিময়ে। এরপর এই মেয়েদের উপর চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। একসময় মেয়েটা মেনে নিতে বাধ্য হয় এমন জীবন। কারন সেই মেয়েটা তখন বেশ বুঝতে পারে এই সভ্যতার মুখোশ পড়া এই নোংরা সমাজে তার কোন মুল্য নেই। তার থেকে এই নিষিদ্ধ পল্লিই বেশ নিরাপদ। তার দেহের বিনিময়ে পরিমানে সামান্য হলেও যে সমাদর পায় সভ্য সমাজের খদ্দেরদের কাছ থেকে, তার মুল্য এদের কাছে অনেক বেশি। পৃথিবীতে মানবতার কি মুল্য, ভালোবাসার কি মর্যাদা, সভ্যতার আড়ালে মানুষ কত নিচে নামতে পারে তা এসব যৌনকর্মি ছাড়া আর কারো কাছে স্পষ্ট হয়না। এরাই বোঝে ভালোবাসা কি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, এরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়। এদের এমন বঞ্চনার পরিবেশ তো আমাদেরই তৈরী করা। আমরাই গোপনে গোপনে এদের ব্যবহার করি আমাদের নিকৃষ্ট চাহিদা মেটাতে, আবার প্রকাশ্যে পেলে এদের মুখে থুতু ছুঁড়ে মারি। আমাদের ঘৃণা করা উচিত এমন সভ্যতাকে।

এমন তো হবার কথা ছিল না? তবু কেন এমন হল? এই মুহুর্তে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধু কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “যুদ্ধে যারা ধর্ষিত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বাবার জায়গায় আমার নাম লিখে দাও। আর ঠিকানা লিখে দাও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর”

তিনি কি এমন সভ্যতা চেয়েছিলেন? মানবতার সামান্য স্পর্শও যদি আমাদের থাকে তবুও কি আমরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, এটাই আসল সভ্যতা? ৭১-এ সেই সব ঘটনা আর আজকের এমন ঘটনার মাঝে তফাতটা কোথায়??

এইমুহুর্তে উল্লেখ করা যায় আরো এক মহামানবের উক্তি,

“এদেশ হিন্দুর নয়, মুসলমানেরও নয়। এ দেশকে যে নিজের দেশ বলে ভাববে এদেশ তার। এদেশের কল্যান দেখে যার মন আনন্দে ভরে উঠবে এদেশ তার। এদেশের দুঃখে যে কাঁদবে এদেশ তার এবং তাদের এদেশ যারা এদেশের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতায় সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে ও ভবিষ্যতেও দেবে।“ – এ কে ফজলুল হক।

সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশুদের ভারী শ্রমে নিয়োগ দেওয়া বেআইনী। এব্যাপারে সরকারের কোন মনিটরিং নেই। শিশুদের নিয়ে যারা কাজ করছেন সেই সব সংগঠনেরও এমন কোন কর্মসূচী নেই যাতে তারা শিশুদের এইসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে পরিত্রাণ দিয়ে তাদের সহনীয় কোন কাজ দেবার ব্যবস্থা করবে।। এই অসহ্য অমানবিক কাজ থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য আমরা কি কিছু করতে পারিনা? তারা যদি কাজই ছেড়ে দেবে তাহলে খাবে কি? বাবা-মা কেই বা কি খাওয়াবে?

আমরা কি দেশের স্বার্থে এমন তিনটি কাজ আজ হতেই শুরু করতে পারি না, যাতে করে শিশুরা কিছুটা হলেও মুক্তভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে???

১. আমরা অন্তত আমাদের বাড়িতে বা আমাদের কারখানায় কাজ করা শিশুটিকে হালকা শ্রমের কাজে নিয়োগ দিতে পারি।
২. বিষাক্ত কারখানা থেকে শিশুদের সরিয়ে এনে আমরা অফিসের টুকটাক কাজে লাগাতে পারি।
৩. আমার শিশুটির হাত ধরে তাকে যখন স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছি, তখন যেন একটিবারের জন্যও এই হতভাগা শিশুদের কথা ভাবি। কারণ মানুষই সমাজ নির্মাণ করে। আপনার-আমার শিশুটির সাথে যেন ওরাও বেড়ে উঠতে পারে। আর সেই আরাধ্য দায়িত্ব কি আমাদের উপরই বর্তায় না ?

আসুন, দেশকে ভালোবাসি। দেশের ভবিষ্যতকে ভালোবাসি দেশেকে গড়ার স্বার্থে। কি, পারবোনা??

লেখকঃ আইনের ছাত্র, ইমেইল- otonushagor@gmail.com

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.