বুধবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত
আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার

আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার

October 11, 2013

 তানভীর চৌধুরীঃ

Flag bdপ্রত্যেক দেশে সংগঠিত অপরাধসমূহ স্বীয় দেশের আদালত দ্বারা মীমাংসিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সংগঠিত যেকোন অপরাধ বাংলাদেশের যেকোন কোর্ট বিচার করতে পারে; তবে এই ক্ষেত্রে অঞ্চল এবং অর্থসম্বন্ধীয় বিষয়টি বিবেচিত হয়ে থাকে। আবার কোন অপরাধ যদি দুইটি ভিন্ন দেশের মধ্যে হয়ে থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা হয়ে থাকে। কিন্তু, আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের পূর্বে যেই যেই দেশের জনগণদের মধ্যে বিরোধ তা স্ব স্ব দেশে বিচারের এখতিয়ার রয়েছে। এগুলোকে রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার বলা হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার মূলত যে দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ সংগঠিত হয়েছে, তাদের কোন রাষ্ট্রের বিচার করার ক্ষমতা বা এখতিয়ার রয়েছে তা নিয়েই আলোচনা করে। স্বভাবতই সবাই নিজের দেশে বিচার করতে চায়; কেননা এতে অপরাধী নিজের দেশের হলে তার শাস্তি কম, ক্ষতিপূরণ আদায় করার সুযোগ থাকলে তা বেশী হারে আদায় ইত্যাদি দিক বিবেচনা করেই স্বীয় দেশে বিচার করতে সবাই মুখিয়ে থাকে। বিরোধ মীমাংসা করতে গিয়ে কোন দেশে বিচার হবে তা নিয়ে পুনরায় বিরোধ সৃষ্টি হয়। আর এই বিরোধ মিটাতে রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার সমাধানের ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় এখতিয়ারকে নাগরিক এবং ঘটনাস্থলের ভিত্তিতে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। নাগরিকের ভিত্তিতে মূলত জাতীয়তা বিবেচনা করা হয় আর ঘটনাস্থল মূলত কোন অঞ্চলে অপরাধটি ঘটেছে তা দেখা হয়।

নাগরিকের ভিত্তিতে যে এখতিয়ার, তা মূলত অপরাধী কোন দেশের নাগরিক এবং উক্ত অপরাধের ফলে যে নাগরিকের ক্ষতি হয়েছে সে কোন দেশের নাগরিক, এই দুইটি ব্যাপার নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ অভিযুক্ত এবং ভিকটিম যেই দেশের নাগরিক, সেই দেশের এখতিয়ার রয়েছে এই বিচার কার্য পরিচালনা করা। ফেলানী মামলাটি যেহেতু বাংলাদেশ এবং ভারত অর্থাৎ দুইটি দেশের নাগরিকের মধ্যকার বিরোধ এবং তা সবার বোধগম্য তাই ফেলানী মামলা দিয়েই উদাহরণ দেওয়া যাক। ফেলানী মামলায় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ ভারতীয় নাগরিক আর ভিকটিম ফেলানী বাংলাদেশের। এই ক্ষেত্রে উভয় দেশের এখতিয়ার রয়েছে এর বিচার করা। যদিও ভারত এর বিচার করছে, কিন্তু বাংলাদেশেরও এখতিয়ার রয়েছে এর বিচার করার। যেহেতু অমিয় ঘোষ ভারতে অবস্থান করছে, সেহেতু ভারত তার বিচার এবং শাস্তি বাস্তবায়ন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তার বিচার করলেও তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাবে কোথায়? কিন্তু কখনও যদি অমিয় ঘোষ বাংলাদেশে আসে, তাহলে বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রেপ্তার করে তার বিচার করতে পারবে; এমন অনেক মামলা রয়েছে বিশ্বজুড়ে। উল্লেখ্য, একই অপরাধের জন্য একের অধিকবার শাস্তি কোন ভাবেই দেওয়া যাবে না, রুল অফ ল অনুসারে।

আবার, অঞ্চলভিত্তিক রাষ্ট্রীয় এখতিয়ারের ক্ষেত্রে দেখা হয় অপরাধটি কোথায় শুরু হয়েছে এবং কোথায় শেষ হয়েছে। অর্থাৎ, দুই দেশের নাগরিকের মধ্যকার অপরাধটি কোন দেশে শুরু হয়েছে এবং কোন দেশে শেষ হয়েছে। যেই দেশে শুরু হবে এবং যেই দেশে শেষ হবে, উভয় দেশের এখতিয়ার রয়েছে ঐ মামলার বিচার করার। এই ক্ষেত্রেও ফেলানী মামলাটি গ্রহণযোগ্য উদাহরণ। কেননা, অমিয় ঘোষ অপরাধ করে ছিলেন অর্থাৎ গুলি করেছিলেন ভারতে বসে, অন্য দিকে ফেলানী মারা গিয়েছে বাংলাদেশে। তাই, অপরাধ শুরুর স্থান ভারত এবং পরিসমাপ্তির দেশ বাংলাদেশ উভয়ের এখতিয়ার রয়েছে এই মামলা পরিচালনা করার।

নাগরিকতা বা জাতীয়তা এবং অঞ্চলের ভিত্তিতেই মূলত রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মামলা বিচার করার এখতিয়ার পেয়ে থাকে। তাছাড়াও প্রটেক্টিব বা সংরক্ষণ প্রিন্সিপলের ভিত্তিতেও যে কোন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মামলা বিচার করার এখতিয়ার পেয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রকে ভিকটিম হওয়াও জরুরী নয়। তবে, এই বিচারের অপরাধ গুলো হতে হবে অবশ্যই মানবতা বিরোধী; যেমন, গণহত্যা সৃষ্টিকারী যে কাউকে যে কোন রাষ্ট্র বিচার করতে পারবে। এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী মামলা রয়েছে(Attorney General of the Government of Israil vs Eichmann, 1961)। আইখম্যানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ঐ মামলায় অভিযুক্ত আইখম্যান একজন জার্মান নাগরিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের অমানবিক উপায়ে ইহুদী হত্যার মূল প্রণেতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আইখম্যানের সংগঠনের প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে অমানবিক উপায়ে হলোকস্ট পন্থায় হত্যা করা হয়। উক্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য পরবর্তীতে ইসরাইল আইখম্যানের বিচার করেছে। পাঠকের মনে আছে নিশ্চয়ই ইসরাইল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবধি কোন রাষ্ট্রই ছিল না, তারা স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে, তা সত্ত্বেও ইসরাইল এই মামলা পরিচালনা করার এখতিয়ার পেয়েছিল প্রটেক্টিব বা সংরক্ষণ প্রিন্সিপলের অধীনে। অর্থাৎ, মানবতা বিরোধী অপরাধ যেই দেশেই হোক তার বিচার যে কোন রাষ্ট্রই যে কোন সময় করতে পারবে। এই হল মোটামুটি আন্তর্জাতিক মামলায় রাষ্ট্রীয় এখতিয়ার। এখন যেই রাষ্ট্র যেই এখতিয়ার দেখিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সাথে জিতবে সেই রাষ্ট্রই অপরাধীর বিচার করবে। উল্লেখ্য, উপরের সব আলোচনাই মূলত আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল বা ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.