রবিবার , ২৫ আগস্ট ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত
শিশু অধিকার আইন ও বাস্তবতা

শিশু অধিকার আইন ও বাস্তবতা

জুন ৩, ২০১৯

তৈমূর আলম খন্দকার: ২৬ মে ২০১৯ জাতীয় দৈনিকে পুলিশ সুপার নরসিংদীর বরাত দিয়ে এ মর্মে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যে, নরসিংদী শহরের উরিয়াপাড়া নতুন লঞ্চঘাটের টয়লেটে শিশুকন্যা নুসরাত জাহান তাইন (১০) ও তানিশা তাইয়েবাকে (৪) গলাটিপে হত্যা করেছে বাবা শফিকুল সলাম। পুলিশ সুপারের মতে, পারিবারিক দারিদ্র্য, মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ না দিতে পারা, আবদার অনুযায়ী মেয়েদের নতুন জামা দিতে না রা- এসব কিছু মিলিয়ে মানসিক ভারসাম্য ও হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে প্রথমে ছোট মেয়েকে লঞ্চ ঘাটের টয়লেটে শ্বাস রোধ করে, পরে বড় মেয়েকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে।

পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় যে, মা-বাবা দ্বারা প্রায়ই শিশুহত্যা চলছে। অন্য দিকে, শিক্ষক বা প্রতিবেশী দ্বারা কন্যাশিশুরা ধর্ষিত হয়ে কোথাও অসুস্থ বা কোথাও নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে। মা-বাবা কর্তৃক শিশু হত্যার মূল কারণ হলো, সাংসারিক দারিদ্র্যসহ দাম্পত্য জীবনের কলহ। আত্মীয়স্বজনরা শিশু হত্যা করে থাকে সম্পত্তির লোভে। আর শিশুদের যারা ধর্ষণ করে তারা জঘন্য মানসিক রোগী। মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ ছাড়া একজন শিশুকে ধর্ষণ করা সম্ভব বলে মনে করি না।

শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিগত শত বছরে রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করেছে, প্রকৃত পক্ষে যার অনেকগুলোরই কার্যকারিতা নেই। মনে হয় যে, সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কোনো জ্ঞান আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। আইনগুলোর নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১। বুকের দুধের বিকল্প (বাজার নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ-১৯৮৪। ২। শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট আইন-২০০২। ৩। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন-২০০৪। ৪। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আইন-২০১৮। ৫। প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলক করণ) আইন-১৯৯০। ৬। সাবালকত্ব আইন-১৮৭৫। ৭। অভিভাবক ও প্রতিপালন আইন-১৮৯০। ৮। বাল্য বিবাহ বিরোধ আইন-২০১৭। ৯। বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধ্যাদেশ-১৯৭৩। ১০। ভ্রমণকর আইন-২০০৩। ১১। সাক্ষ্য আইন-১৮৭২। ১২। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০। ১৩। আধিবাসী শিশুর অধিকার আইন। ১৪। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন-২০০১। ১৫। বঙ্গীয় জেল সংহিতা ১৮৬৪ এর ৯৪৭ বিধি। ১৬। বঙ্গীয় ভবঘুরে আইন-১৯৪৩। ১৭। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আইন-১৯৯৯। ১৮। কিশোর ধূমপান আইন-১৯১৯। ১৯। শিশু আইন ২০১৩ যা কিছুটা সংশোধন করে ‘শিশু (সংশোধন) আইন ২০১৮’ নামে অনুমোদিত হয়। ২০। আরো কিছু আইন যাতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি শিশু অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

১৯৮৯ সালে জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেছে। যার ফলে সরকার শিশু আইন-১৯৭৪ বাতিল করে নতুন আঙ্গিকে ১০০টি ধারাসংবলিত শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অন্যান্য অনেক রাষ্ট্র রয়েছে যেখানে রাষ্ট্র শিশুদের অভিভাবকত্ব নিয়ে তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আইনগতভাবেই ব্রিটেনের রানী তার রাষ্ট্রের সব শিশুর অভিভাবক। ফলে শিশুর ভরণপোষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিচর্যাসহ সবকিছুই দেখাশোনার দায়িত্ব রানী গ্রহণ করেছেন। ১৯৭৪ সালের শিশু-আইন মোতাবেক শিশু অপরাধীদের মানসিক, চারিত্রিক উন্নয়নের জন্য ‘কিশোর অপরাধ কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছিল, যা শিশু আইন-২০১৩ মোতাবেক ‘শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র’ নামে পরিচিত। এটা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত। শিশু অপরাধীদের উন্নয়নের বা তাদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার কী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে তা দেখার জন্য ২৩ মার্চ ২০১৯ শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক) টঙ্গী, গাজীপুর সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রাপ্ত তথ্য নিম্নে উল্লেখ করেছি।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক), টঙ্গী, গাজীপুরের প্রতিষ্ঠাকাল : ১৯৭৮ সাল।
শিশু নিবাসী পরিসংখ্যান : অনুমোদিত আসন – ৩০০ জন বিচারাধীন শিশু – ৬৩৫ জন আটকাদেশ শিশু – ০৮ জন ২৩-৩-১৯ ইং মোট শিশুর সংখ্যা ৬৪৩
শিশুদের মাসিক মাথাপিছু বরাদ্দ খাদ্য, দুধ ও জ্বালানি ২,০০০/- শিক্ষা ও খেলাধুলা সামগ্রী ২০০/- প্রশিক্ষণ সামগ্রী ১২০/- সাধারণ পোশাক ১২০/- চিকিৎসা সামগ্রী ৬০/- তেল, সাবান ও প্রসাধনী ১০০/-

শিশুদের খাদ্য তালিকা বার সকালের নাস্তা দুপুরের খাবার বিকেলের নাস্তা রাতের খাবার শনিবার ভাত, আলু ভর্তা ভাত, মাছ, সবজি, ডাল মুড়ি, চানাচুর ভাত, সবজি গোশত, ডাল রোববার ভাত, ডাল ভাত, মুরগির গোশত, আলু, ডাল কলা ভাত, সবজি, ডাল সোমবার ভাত, আলু ভর্তা ভাত, ডিম, সবজি, ডাল বনরুটি ভাত, সবজি গোশত, ডাল মঙ্গলবার ভাত, ডাল ভাত, মাসের প্রথম ও তৃতীয় সপ্তাহ গরুর গোশত এবং দ্বিতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহ মুরগির, আলু, ডাল সিঙ্গারা ভাত, সবজি, ডাল বুধবার ভাত, আলু ভর্তা ভাত, মাছ, সবজি, ডাল মুড়ি, চানাচুর ভাত, অর্ধেক ডিম, সবজি, ডাল বৃহস্পতিবার খিচুড়ি ভাত, ডিম, সবজি, ডাল কলা ভাত, সবজি, দুধ, চিনি শুক্রবার ভাত, ডাল ভাত, মুরগির গোশত, আলু, ডাল সিঙ্গারা ভাত, সবজি গোশত, ডাল

তালিকাদৃষ্টে দেখা যায় যে, প্রতি মাসে খাদ্য হিসাবে একজন শিশুর জন্য ২,০০০/- টাকা রাখা হয়েছে। সে মতে দৈনিক একজন শিশু প্রতি খাদ্য হিসাবে সরকার ৬৬.৬০ টাকা খরচ করে থাকে। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী, ৬৬-৬৭ টাকা একজন শিশু চাহিদা পূরণে যথেষ্ট কি না তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। যেখানে ৩০০ জনের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে ৬৪৩ জনকে থাকতে হয়। বর্ণিত তথ্য মোতাবেক সরকার শিশুদের প্রতি যতটা যত্নবান হওয়ার কথা ছিল ততটুকু যত্নবান অবশ্যই নয়।

পুষ্টিহীনতার কারণেও শিশুরা হিংসাত্মক অপরাধ করে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, অ্যামিনো অ্যাসিড, সোডিয়াম পেপটিসাইড প্রভৃতি খনিজ পদার্থের ঘাটতিজনিত কারণে শিশু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বলে হিংসাত্মক আচরণ ও অপরাধ করে। চিকিৎসাবিদদের মতে, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে শিশুদের খাদ্যের জন্য বরাদ্দকৃত ৬৬-৬৭ টাকা পুষ্টির জন্য কতটুকু সহায়ক? এ জন্য অবশ্যই সরকারকে দায়ী করা যায়।

শিশু আইন-২০১৩ মোতাবেক বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, অর্থাৎ ৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যাই শিশু। দণ্ড বিধির ৮২ ধারা মোতাবেক ৯ বছর পর্যন্ত কোনো শিশু অপরাধ করলে সে ‘কোনো অপরাধ করেনি’ বলে ধরে নেয়া হবে এবং দণ্ড বিধির ৮৩ ধারা মোতাবেক ৯ থেকে ১২ বছরের শিশু যদি অপরাধ করে, তার বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করে যদি অপরাধ জ্ঞানের পরিপক্বতা পাওয়া যায়, তবেই সে শিশু আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী বলে গণ্য হবে। শিশু আইনের (২০১৩) এর ৪ ধারা মোতাবেক শিশুর বয়স ১৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য আইনের শিশুর বয়স বিভিন্নভাবে নির্ধারণ করা আছে। চুক্তি আইন ১৮৭২ মোতাবেক ১৮ বছর এবং শিশুকর্মে নিয়োগ আইন ১৯৩৪ মোতাবেক ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিশুরাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাদের বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। শিশু মনোবিজ্ঞানী হ্যারল্ড এস হ্যালবার্ট বলেছেন, ভালোবাসা কী বিষয় তা শিশুরা বুঝে ওঠার আগেই শিশুদের ভালোবাসা দিতে হবে। সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকারি-বেসরকারিভাবে একটি শিশুর পরিচর্যার জন্য রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবার হিসেবে আমরা কতটুকু যত্নবান- এ বিষয়টি এখনই বিবেচনায় নেয়া দরকার। রাষ্ট্র পরিচালিত শিশু কেন্দ্রগুলোতে বসবাসরত শিশুদের ভালোবাসা কে দেবে?

শিশু সম্পর্কিত একটি গবেষণায় গত ২৮ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গৃহে শিশুর বিকাশের উপযোগী উদ্দীপনামূলক কার্যক্রম নেয়া হলে শিশুদের মানসিক বিকাশ ভালো হয়। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য, ভালো থাকা এবং জীবনের সফলতার জন্য শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর অপরিপূর্ণ বিকাশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় আড়াই কোটি শিশু তাদের বিকাশের সর্বোচ্চপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। এর জন্য দায়ী বহুবিধ ঝুঁকি, যেমন দারিদ্র্যের দরুন পুষ্টির অভাব। এ কারণে শিশু বিকাশসংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবার সাথে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া হলে শিশুর জন্য সহায়ক হতে পারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থা ও
সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.