রবিবার , ২৫ আগস্ট ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত
মিন্নির পক্ষে আইনজীবী না দাঁড়ানোয় ফেসবুকে নিন্দার ঝড়

মিন্নির পক্ষে আইনজীবী না দাঁড়ানোয় ফেসবুকে নিন্দার ঝড়

জুলাই ১৮, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক: বহুল আলোচিত রিফাত হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ওপ্রত্যক্ষদর্শী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের পর বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু তার পক্ষে কোনও আইনজীবী দাঁড়াননি। এ বিষয়ে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘আমি তিন জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাদের দাঁড়ানোর কথা ছিল। আমার মনে হয় প্রতিপক্ষদের ভয়ে তারা আমার মেয়ের পক্ষে দাঁড়াননি।’ কোন প্রতিপক্ষের কারণে আইনজীবী দাঁড়াননি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘কোন প্রতিপক্ষ সেটা আপনারাই বুঝে নেন। আমি বলতে গেলে বরগুনায় থাকতে পারবো না।’

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি কেবল এ মামলার সাক্ষীই নন, তিনি নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রীও। ঘটনার দিন তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে সেই দৃশ্যও দেখা গেছে। ফেসবুকে মিন্নির এই সাহসিকতরে প্রশংসাও করেছেন অনেকে। কিন্তু গতকাল বরগুনার আদালতে মিন্নির পক্ষে বারের একজন আইনজীবীও এগিয়ে আসেননি। সংবাদ মাধ্যমে এ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা ঝড় বইতে থাকে। ফেসবুকে বিভিন্ন মন্তব্য ও প্রশ্ন রেখে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিভিন্ন জনে। রাজনীতিক ও অধিকার কর্মী তাহেরা বেগম জলি তার ওয়ালে লিখেছেন—

একজন আইনজীবী পাওয়ার অধিকারও মিন্নির নেই?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কতিপয় দুর্বৃত্ত মিন্নিকে নিয়ে কুৎসিত প্রচারে মেতে উঠেছে। যা শত নারী ধর্ষণের সমান। আমরাও যখন এখানে মিন্নির ব্যাপারে স্বচ্ছতার দাবি তুলছি,তখনও দুই একজন ভদ্রলোক(!)বিকৃত নোংরা পদ্ধতিতে আমাদের সামনে হাজিরা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই সেদিনও যে অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে নিয়ে এমনই বীভৎস খেলায় মেতে উঠেছিল সিরাজ বাহিনী,তা আসলে মনে থাকে না। আমরা ভুলে যাই, কিছু নরপশু দেখতে অবিকল মানুষের মতই। নুসরাতের বিরুদ্ধে ঘাতক নিজে ধর্ষক সিরাজের পক্ষে ব্যানার নিয়ে রাজপথ দখল করেছিল। অবিকল কিনা জানি না,তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি মিন্নির বিরুদ্ধেও কিছু অভিজাত দুর্বৃত্ত একইভাবে মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। নুসরাতের বিরুদ্ধে ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারের ভূমিকা আমরা সকলেই জানি। ঠিক একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বরগুনাতেও। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! সেই ধর্ষক নুসরাত হত্যাকারী সিরাজের জন্য উকিলসমাজ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ধর্ষণের সাফাই গাইছে। আমরা তবে কোথায় যাবো। তবুও সমগ্র নারী জাতির যা হয় হবে। কিন্তু যারা বাবা মা? তারা একটু ভাববেন না? এমন অসংখ্য উকিল তো আছেন,যারা কন্যা সন্তানের জনক জননী। অন্তত তারা কেন দাঁড়াবেন না মিন্নির পাশে। আমি জানি না,বা এপর্যন্ত বলিনি মিন্নি প্রশ্নবিদ্ধ নয়। কিন্তু এটুকু আমরা কেন দাবি করবো না,মিন্নি আর ১০ জনের মতোই বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। মিন্নিকে নিয়ে যা ঘটছে,তাতে এই দাঁড়াচ্ছে,ওকে নিয়ে যা খুশি তাই করা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের এক পরিচিত সম্ভ্রান্ত নারীকে খানসেনারা দড়ি দিয়ে ট্রাকের পেছনে বেঁধে গোটা মাগুরা শহর টেনে নিয়ে বেড়িয়ে এক সময় মৃত রক্তাক্ত ওই নারীকে নদীর ধারে ফেলে দেয়। আমাদের দেশের নারীদের নিয়ে খান সেনা এবং রাজাকারের সেই বীভৎস উল্লাস কি আজও বন্ধ হবে না? তা না হলে মিন্নির জন্য বরগুনার একজন আইনজীবীরও কেন মনে হোলো না,কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মস্তবড় অন্যায়। মিন্নিকে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে যে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হলো, এটা স্বাধীন দেশের একটা কালো অধ্যায়!’

সাংবাদিক রাজীব নূর তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘মেয়েটার পক্ষে কোনও আইনজীবী দাঁড়ালেন না। অথচ মিন্নির বাবা তার মেয়ের জন্য জিয়া উদ্দিন, গোলাম মোস্তফা কাদের ও গোলাম সরোয়ার নাসির নামে তিনজন আইনজীবীকে নিয়োগ করেছিলেন। তারা আদালতে দাঁড়াতে না পারার ব্যাখ্যা হিসেবে ওকালাতনামায় স্বাক্ষর নিতে না পারার অজুহাত দেখিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আদালতে বিচারক মিন্নির কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তার পক্ষে কোনো আইনজীবী রয়েছেন কিনা? আমি আমার আইনজীবী বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করে নিশ্চিত হয়েছি, তখন চাইলেই ওই তিন জন অনায়াসে নিজেদের মিন্নির পক্ষভুক্ত করে নিতে পারতেন। কেন তারা তা করেননি অনুমান করা কঠিন নয়। আমি বলছি না মিন্নি নির্দোষ। এমনটা দাবি করার কোনো সুযোগ আমার নেই। তবে মিন্নিকে দোষী সাব্যস্ত করা গেলে কার লাভ, সেটা আরো অনেকের মতো আমিও বুঝতে পারছি।মিন্নির বাবা ওর রিমান্ড শুনানির সময় কোর্টের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন এবং কাঁদছিলেন বলে বরগুনার এক সাংবাদিক বন্ধু বিকেলেই জানিয়েছিলেন আমাকে। কার ভয়ে?

সাংবাদিক সালেহ বিপ্লব লিখেছেন, ‘মিন্নির পক্ষে নাকি কোনও আইনজীবী আদালতে দাঁড়াচ্ছেন না! এ কেমন কথা? এ কেমন আইনের শাসন? হতে পারে মিন্নি জড়িত ছিলেন রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে। হতে পারে মিন্নির স্বভাবচরিত্র ভালো না। আরো বহু কিছু হতে পারে। এমনকি মিন্নি সম্পর্কে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার রিডিং ইঙ্গিত করে কুৎসিৎ কোনও ঘটনাপ্রবাহের দিকে, এটাও হতে পারে। কিন্তু তিনি এই মামলায় আইনি সহায়তা পাবেন না, এটা একটা জঘন্য ব্যাপার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে মিন্নিকে অবশ্যই আইনগত সহায়তা দিতে হবে। কোনও আইনজীবী তার পক্ষে না দাঁড়ালে সরকারের দায়িত্ব তার পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা।’

মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন, ‘মিন্নির পক্ষে স্থানীয় কোনও আইনজীবী লড়তে চাচ্ছেন না। কারণ, হিসেবে তারা বলেছে, এতে তারা বিতর্কিত হবেন।আচ্ছা, মিন্নি কি একজন স্বীকৃত ধর্ষক? কিন্তু স্বীকৃত ধর্ষকের পক্ষেও তো আইনজীবীরা লড়তে কুণ্ঠাবোধ করে না। আহা দুনিয়া!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.