সোমবার , ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত
অসুস্থ মিন্নি ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে ওঠেন

অসুস্থ মিন্নি ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে ওঠেন

সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

ডেস্ক রিপোর্ট: বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও আসামি তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি কিছুদিন আগে জামিনে মুক্ত হয়ে বাবার বাড়িতে বাবা মোজ্জাম্মেল হোসেন কিশোরের জিম্মায় রয়েছেন। বর্তমানে তিনি পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও দীর্ঘদিন কারাভোগের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার ওপর স্বামীর নৃশংস খুন নিজ চোখে দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। মিন্নি এখন ঘুমের মধ্যে কাঁদেন, নিজের অজান্তেই হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন। মিন্নির পারিবারিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মিন্নির উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। তিনি ভীষণ অসুস্থ। কিন্তু মামলার পরবর্তী তারিখ কাছাকাছি থাকায় তাকে ভালো কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা যাচ্ছে না। বাড়িতেই চিকিৎসা চলছে তার। আগে মিন্নি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, চঞ্চল ও সদালাপী। কিন্তু বর্তমানে পাল্টে গেছেন মিন্নি। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকাছেন। কী যেন একাকিত্ব ভর করেছে মনের মধ্যে। শারীরিকভাবে অসুস্থ মিন্নি এখন স্বামী রিফাত শরীফের স্মৃতিতে কাতর। একরাশ বিষন্নতা নিয়ে একাকি ঘরে দিন কাটে মিন্নির। মিন্নির এমন জীবনযাপনে চিন্তিত স্বজনরা। উদ্বিগ্ন তার বাবা-মা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই শর্তে হাইকোর্টের রায়ে জামিন পেয়ে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন মিন্নি। কারামুক্ত মিন্নির সঙ্গী এখন শারীরিক অসুস্থতা। একপ্রকার মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে বাবার বাড়িতে জীবনযাপন করছেন তিনি। মিন্নি মা-বাবা ছাড়া আর কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর দেন না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। পুলিশ নির্যাতন করেছে কিনা জিজ্ঞেস করলে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। মুখ ফোটে কিছুই বলেন না। কি যেন অব্যক্ত কষ্ট পাথর চাপা দিয়ে রেখেছেন বুকে।

মিন্নির বাবা বলেন, পুলিশ হেফাজতে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে মেয়েটার ওপর। দুই হাঁটুতে কালো দাগ রয়েছে মিন্নির। হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে পারে না সে। চঞ্চল ও সদালাপী মিন্নি এখন কারও সঙ্গে কথা বলে না। খেতে চায় না কিছুই। নিজের ঘরে সবসময় চুপচাপ থাকে সে। কখনো কখনো কাঁদে মিন্নি। যে ঘরে মিন্নি থাকে সেই ঘরে রিফাতের সঙ্গে তার অনেক স্মৃতি। এসব স্মৃতি মিন্নিকে আপ্লুত করে।

মিন্নির অসুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মিন্নির অসুস্থতার বিষয়টি আমি জানি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে মিন্নির আইনজীবী জেড আই খান পান্নার সঙ্গে কথা বলেছি আমি। মিন্নির চিকিৎসার জন্য আমি মিন্নির বাবাকে পারামর্শ দিয়েছি। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর রিফাত হত্যা মামলার ধার্য তারিখ রয়েছে। তার আগেই মিন্নিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় কিংবা অন্যত্র নেয়া যাবে। কারণ ধার্য তারিখে মিন্নিকে আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে।

মিন্নির মা জিনাত জাহান মনি মেয়েকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখানে উপস্থিত লোকজন ‘জেলখানায় কেমন ছিলেন’ জানতে চাইলে মিন্নি দ্রুত ঘরে ঢুকে যান। পরে মিন্নির বাবা আগত সবাইকে মিষ্টিমুখ করান।

গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলা ও বাবার জিম্মায় থাকার শর্তে জামিন পেয়েছেন মিন্নি। জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার সময় মিন্নিকে সেই শর্তের কথা মনে করিয়ে দেন তার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম। এর পর থেকে চুপ হয়ে যান মিন্নি। বাসায় ফিরে বাবা-মা ছাড়া কারও সঙ্গেই কথা বলছেন না তিনি। তবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো বক্তব্য না দিলেও মিন্নি তার ওপর চালানো পুলিশের অমানুষিক নির্যাতনের কথা বাবাকে জানিয়েছেন।

মিন্নিকে পুলিশ হেফাজতে ঘুমাতে দেয়া হয়নি জানিয়ে কিশোর বলেন, আদালতে তোলার আগের রাতে মিন্নিকে ঘুমাতে দেয়া হয়নি। সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও দেয়া হয়নি।

তিনি আবারও বলেন, আমার মেয়ে ছিল সাক্ষী। একটি প্রভাবশালী মহলের কারণে তাকে আসামি করা হয়েছে। আমার মেয়ে তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেদিন সন্ত্রাসীদের সামনে পড়েছে। অথচ তাকে আসামি করে দীর্ঘদিন জেলে আটকে রাখা হলো।

বরগুনা সরকারি কলেজগেটের সামনে ২৬ জুন সকালে নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও তার সঙ্গীরা রিফাত শরীফকে কুপিয়ে জখম করে। বিকালে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। পর দিন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ১৬ জুলাই মিন্নিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে তা শেষ হওয়ার আগেই ১৯ জুলাই তদন্ত কর্মকর্তা মিন্নিকে বরগুনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করেন। এরপর মিন্নি হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। ২১ জুলাই বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নির আইনজীবী জামিনের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করেন আদালত। ২৩ জুলাই তার আইনজীবী বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিনের আবেদন করেন।

৩০ জুলাই তা নামঞ্জুর হলে ওই আদেশের বিরুদ্ধে ৬ আগস্ট হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী। ৮ আগস্ট হাইকোর্ট রুল দিতে চাইলে মিন্নির আইনজীবী আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। পরে হাইকোর্টের অন্য বেঞ্চে আবেদন করেন আইনজীবী।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট মিন্নিকে কেন জামিন দেয়া হবে না- মর্মে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দুই শর্ত দিয়ে মিন্নির অন্তর্বর্তী স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করে রায় দেন।

শর্ত দুটি হলো- ১. জামিনে থাকাবস্থায় মিন্নি তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের জিম্মায় থাকবেন; ২. জামিনে থাকাবস্থায় তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। এই দুই শর্তের ব্যত্যয় ঘটলে মিন্নির জামিন বাতিল হবে বলে রায়ে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত চেয়ে করা রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদনের ওপর নো-অর্ডার (কোনো আদেশ নয়) দেন সুপ্রিমকোর্টের চেম্বার আদালত। ফলে মিন্নির জামিনে মুক্তিতে বাধা কাটে।

এ/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.