রবিবার , ১৮ নভেম্বর ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত

মানবাধিকার ও প্রাথমিক আইন বিষয়ক সচেতনতা মূলক প্রশ্নোত্তর।

জানুয়ারি ২১, ২০১৩

অ্যাডভোকেট এ.এম জিয়া হাবীব আহসান:

আজকের শিশু আগামীতে দেশ ও সমাজ পরিচালনা করবে। দেশের জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ শিশু,কিশোর,কিশোরী। শিশু,কিশোর,কিশোরীদের অবস্থার উন্নতি,তাদের অধিকার বাস্তবায়ন,সর্বোপরি শিশু,কিশোর,কিশোরীদের নেতৃত্ব গুনসম্পন্ন ও দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনেক সংস্থা,সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

law questionsকিন্তু শিষ্টাচার সম্পন্ন এবং অধিকার সচেতন আধুনিক মানুষ হিসেবে শিশু,কিশোর,কিশোরীদের গড়ে উঠার ব্যাপারে সহায়ক কর্মসূচী কেউ গ্রহন করছে না। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্‌ ফাউন্ডেশন মনে করে যে,অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাবোধ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় মডেল সৃষ্টির লক্ষে মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্‌ ফাউন্ডেশন “মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন”এর সহায়তায় “হিউম্যান রাইটস্‌ এন্ড গুড গভর্নেন্স”প্রোগ্রাম এর আওতায় স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আইন অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ছাত্র- ছাত্রীগন শিক্ষা জীবন থেকে বিভিন্ন আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এবং এ ব্যাপারে স্বচ্ছধারণা থাকলে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যতে তারা একজন দক্ষ মানবাধিকার কর্মী হিসেবে গড়ে উঠবে বলে সংগঠন বিশ্বাস করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের আলোকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুন্দর ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকলের মধ্যে ছাত্রজীবন হতে নিজের অধিকার এবং অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ,সচেতনতাবোধ সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরী। এছাড়াও আইনের ছদ্মাবরনে বে-আইনি কাজ প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইন ও অধিকার সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা অর্জন করা। আইন না জানলেও আইন ধরে নেয় যে,সকলেই আইন জানেন। ফলে না জেনে অপরাধ করার অজুহাতে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই আইন ও অধিকার সম্পর্কে জ্ঞানলাভের মাধ্যমে আইনে স্বীকৃত ন্যায় অন্যায়ের মানদন্ড সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। এই বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রেখেই দেশের ভবিষ্যত চালিকাশক্তি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ হিউম্যান রাইট্‌স ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ এর আজকের এই প্রয়াস। আমরা মনে করি জুবিন্যাল জাষ্টিস ও শিশু আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব। এতে নারী ও শিশু প্রতি সকল সহিংসতা বন্ধ হবে। একই সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রী তাদের ভবিষ্যত সুদৃঢ় করার জন্য তথ্য অধিকার আইন জানা প্রয়োজন। তথ্য অধিকার আইন একদিকে যেমন জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধি করবে তেমনি নিজের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহস জোগাবে।

০১।মানবাধিকার কি?
সহজ ভাষায় মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের সহজাত অধিকার যা যে কোন মানব সন্তান জন্মলাভের সাথে সাথে অর্জন করে। মূলত যে অধিকার মানুষের জীবন ধারনের জন্য,মানুষের যাবতীয় বিকাশের জন্য ও সর্বপরি মানুষের অন্তরনিহিত প্রতিভা বিকাশের জন্য আবশ্যক তাকে সাধারনভাবে মানবাধিকার বলা হয়। জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার অধিকার এবং মতামত প্রকাশের অধিকার,অন্ন বস্ত্র ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার,ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অংশগ্রহণের অধিকার প্রভৃতি সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারকে মানবাধিকার বলতে পারি।

০২।শিশু অধিকার বলতে কি বুঝি?
সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর অধিকার। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র শিশুর জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী ’’। অনুচ্ছেদ ৩৪ জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইনে শিশুর জন্য স্বীকৃত অধিকারকে শিশু অধিকার বুঝায়।

০৩।কেউ যদি কোন শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করে তাহলে কোন আইনের কোন ধারায় মামলা করা যায়?
শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য ‘‘শিশু আইন ১৯৭৪’’এর ৩৪ ধারায় মামলা করা যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে,যার হেফাজতে কোন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে শারীরিক ক্ষতি,মানসিক বিকৃতির সম্মুখীন হয়,সে ব্যক্তি দুই বছরের কারাদন্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধিত- ২০০৩ এ বলা আছে,“যদি কোন ব্যক্তি মুক্তিপন আদায়ের উদ্দেশ্যে কোন নারী বা শিশুকে আটক করেন,তাহলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবেন”।

০৪।কোন ব্যক্তি যদি কোন শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তির জন্য নিয়োগ করে তাহলে তার শাস্তি কি?
শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তির জন্য নিয়োগের দন্ড ‘‘শিশু আইন ১৯৭৪’’এর ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে যে,ভিক্ষার উদ্দেশ্যে কোন শিশুকে ব্যবহার করলে যে ব্যক্তি শিশুকে এ কাজে ব্যবহার করে সে এক বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা তিনশত টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধনী ২০০৩ এর আইনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে,“যদি কোন ব্যক্তি ভিক্ষাবৃত্তি বা অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিক্রির উদ্দেশ্যে কোন শিশুর হাত,পা,চক্ষু বা অন্য কোন অঙ্গ বিনষ্ট করেন বা অন্য কোনভাবে বিকলাঙ্গ বা বিকৃত করেন,তাহলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবেন।”

০৫।আমাদের দেশে যে সব লোক শিশুদের কাজে নিয়োগ দিয়ে শিশুদের শোষণ করে,ঐ সব ব্যক্তিদের জন্য কি শাস্তি রয়েছে?
‘‘শিশু আইন ১৯৭৪’’এর ৪৪ বিধান মতে,চাকুরী দেয়ার নামে যে সব লোভী মানুষ নিজেদের স্বার্থেশিশুদের অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জন করে তারা এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে।

০৬।আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ বলতে কি বোঝায়?
‘‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’’বিশ্বের দেশে দেশে এ কথার অর্থ এক ও অভিন্ন হলেও বিশ্বের আরো অনেক দেশের শিশুদের সাথে আমাদের দেশের শিশুদের অনেক পার্থক্য রয়েছে। এ দেশে ১৮ বছর হবার আরো অনেক আগেই শিশুরা লিপ্ত হয় জীবন সংগ্রামে। অনেক কম বয়স থেকেই তারা বিভিন্ন ধরনের ভারী,বিপদজনক এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। দারিদ্রতার কারণে এ দেশের শিশুরা পদে পদে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বরজাতিসংঘের সদরদপ্তরে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ পেশ হয় এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ থেকে এ সনদের বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হয়েছে।

০৭।তথ্য অধিকার কি?
যে- সব তথ্য সাধারণ নাগরিকের রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার অর্জনে সহায়ক,যার অভাবেএই অধিকারগুলো অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে,রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নাগরিক নিরবিচ্ছন্নভাবে বা বাধাহীনভাবে অংশ নিতে পারেনা,সেসব তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সাধারণভাবে তথ্য অধিকার বলে।

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯- এর সংজ্ঞা:
বাংলাদেশ সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে- রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই সরকারের কাছে যে তথ্য আছে সেটার মালিকও জনগণ। অর্থাৎ ঐ তথ্য শুধু সরকারের একার সম্পত্তি নয়। সরকার তার কাজকর্মের মাধ্যমে যে তথ্য সংগ্রহ করে বা তৈরি করে সেই তথ্য জনগণের জন্যই। জনগনের সম্পদ কাজে লাগিয়ে,জনগণের উন্নতি বা মঙ্গলের জন্যই সরকার কাজ করে। আর এই ধারণা থেকেই এসেছে জনগণের তথ্য জানার অধিকার।

তথ্য অধিকার আইন কেন দরকার?
মানুষ যখন বুঝতে পারবে,তাদের জীবনের সাথে সংশি­ষ্ট অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কে জানাটা তাদের অধিকার এবং এই অধিকারটা আদায়ের জন্য একটা আইন আছে- তখনই তারা খুব সহজেই এই আইনটি ব্যবহার করতে শুরু করবে। আর মানুষ যখন তার জীবনের সঙ্গে সংশি­ষ্ট অতি প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে আইনগতভাবে দাবি জানাবে,তখন কর্তৃপক্ষ আর চুপ থাকতে বা তথ্য গোপন রাখতে পারবে না। অন্যদিকে অকার্যকর তথ্য সংরক্ষণ-পদ্ধতি এবং সরকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকায় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জনগণ সমস্যার মুখোমুখি হন প্রায়ই। তথ্য অধিকার আইনের অধীনে নথি সংরক্ষণের ওপর যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে,তেমনি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপরেও । যা সমাজে একটি স্বচ্ছতা জবাবদিহিতামূলক একটি সংস্কৃতি চালু করবে।

০৮।ইভটিজিং বা উত্যক্ত করার শাস্তি কি?
সমাজে দুরারোগ্য ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে ইভটিজিং। যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে নারীকে উত্যক্ত করার এক ভয়াবহ রূপ এই ইভটিজিং। এই যৌন হয়রানির শাস্তি অনধিক সাত বছর কিন্তু কমপক্ষে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবে।

০৯।আত্মহত্যায় প্ররোচনার শাস্তি সম্পর্কে আইন কি বলে?
সিমি,রুমি,তিশার মতো অসংখ্য মেয়ে আমরা হারিয়েছি যাদের উত্যক্ত করে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে। একইভাবে যৌতুকসহ অন্যান্য কারনে প্রতিনিয়ত নির্যাতন করে অনেক মেয়েকেই বাধ্য করা হচ্ছে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে। আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীর জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ক ধারায় বলা হয়েছে,“যদি কোন ব্যক্তি কোন নারীর ইচ্ছার বিরূদ্ধে কোন কার্য দ্বারা তার সম্ভ্রমহানী করে এবং এর ফলে সেই নারী আত্মহত্যা করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি উক্ত নারীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দানের অভিযোগে অভিযুক্ত হবে। যার শাস্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদন্ডসহ এর অতিরিক্ত অর্থদন্ড।”এছাড়াও দন্ডবিধি আইনের ৩০৬ ধারায় বলা হয়েছে,“যদি কোনব্যক্তি আত্মহত্যা করে তাহলে যে ব্যাক্তি আত্মহত্যায় সাহায্য করেছে এবং প্ররোচনা দান করবে সে ব্যক্তি দশ বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনামশ্রম কারাদন্ড এবং তাকে অর্থদন্ডেও দন্ডিত করা হবে।”

১০।ইন্টারনেটে কোন অপরাধ করলে শাস্তির বিধান কি?
বর্তমানে ইন্টারনেট নতুন প্রজন্মের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে,ইন্টরনেটের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক,টুইটার বিভিন্ন ওয়েবসাইট সর্বাধিক জনপ্রিয়। কিন্তু,অনেক সামাজিক যোগাযোগের এ সব মাধ্যমে নিকৃষ্টতম ব্যবহার তথা অশ­ীল,মিথ্যা,বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশপূর্বক অপরাধ সংগঠন করে থাকে। এক্ষেত্রে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭(২) ধারা অনুযায়ী অনধিক ১০ বৎসর কারাদন্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অথর্দন্ডে দন্ডিত করার বিধান আছে।

১১। সাধারন ডায়েরী/ জেনারেল ডায়েরী (জি.ডি) কি?
জিডি হচ্ছে জেনারেল ডায়েরী বা সাধারণ ডায়েরী। এই ডায়েরী হলো অপরাধ বা ক্ষতি সংঘটনের আশঙ্কাজনিত বিবরণ। আপনি যদি আশংকা করেন যে,কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারে বা আপনার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ক্ষেত্রে আপনি আইনের সহায়তা চান,তাহলে উক্ত আশংকার বিবরন দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবার জন্য থানায় দরখাস্ত দেয়াকেই জেনারেল ডায়েরী বা সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করা বলে।

১২। কোন কোন ক্ষেত্রে জি.ডি করা যায়?
কোন ব্যক্তি তার নিজের বা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটনের আশংকা থাকলে বা কেউ হুমকি দিলে,কিছু হারিয়ে গেলে বা হারানোর আশংকা থাকলে,বাড়ীর কাজে অপরিচিত লোক নিয়োগ দিলে বা না বলে চলে গেলে সেক্ষেত্রে জিডি করতে হয়।

১৩। এজাহার কি?
অপরাধ সম্পর্ক থানায় প্রথম যে সংবাদ দেয়া হয় সেটাই এজাহার বা এফআইআর (ফার্ষ্ট ইনফরমেশন রির্পোট)। এজাহার বা এফআইআর হচ্ছে ঘটনার লিখিত প্রথম বিবরণ। এর ওপর ভিত্তি করেই তদন্ত কাজ শুরু হয়। এজাহার বা এফআইআর মৌখিকভাবেই দেয়া যেতে পারে আবার লিখিতভাবেও দেয়া যেতে পারে।

১৪। কে এফআইআর বা এজাহার করতে পারে?
যার বিরুদ্ধে বা যার পরিবারের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে,এমন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পক্ষে যে কোন ব্যক্তি যিনি অপরাধটি সংঘটিত হতে দেখেছেন,তিনি এজাহার বা এফআইআর করতে পারেন,এছাড়া যে কেউ যিনি সংঘটিত ঘটনা জানেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন তিনিও এজাহার বা এফআইআর করতে পারেন।

১৫। জিডি বা এজাহার করতে থানায় কোন টাকা লাগে কি?
না,জিডি এবং এফআইআর বা এজাহার কোনটা করার জন্যই থানায় টাকার প্রয়োজন হয় না। এর জন্য কোন ফি ধরা নেই। সংশি­ষ্ট থানায় গেলেই দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জিডি এবং এফআইআর লিপিবদ্ধ করবেন।

১৬।সিডো কি?
নারী পুরুষের মাঝে সকল ধরণের বৈষম্য দূর করে সম অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৭৯ সালের ১৮ডিসেম্বরগৃহিত হয় “নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ”(সিডো)। এর পূর্ণরূপ The Convention on the Elimination of all forms Discrimination Against Women (CEDAW).

১৭।পারিবারিক সহিংসতা কি?
গত অক্টোবর’২০১০ মহান জাতীয় সংসদে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ ও শিশু অধিকার সনদ এর স্বাক্ষরকারীরাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সংবিধানে স্বীকৃতনারী ও শিশুর সম অধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে পাশ হয় “পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন,২০১০”। এ আইন মতে,পারিবারিক সহিংসতা বলতে,পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোন ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অপর কোন নারী বা শিশু সদস্যের উপর শারীরিক,মানসিক,যৌন নির্যাতন অতবা আর্থিক ক্ষতি সাধন করাকে বুঝায়।

১৮। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনে সুরক্ষা আদেশ লংঘনের শাস্তি কি?
সুরক্ষা আদেশ বা এর কোন শর্ত লংঘন করলে লংঘনকারীকে ১ম বার অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট অপরাধী ৬ (ছয়) মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। পরবর্তী প্রত্যেকবার অপরাধের জন্য অপরাধী ২ (দুই) বছরের কারাদন্ড এবং ১লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

১৯। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনে কেউ মিথ্যা মামলা করলে তার শাস্তি কি?
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনেমিথ্যা মামলা প্রতিরোধের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কেউ এ আইনে মিথ্যামামলা দায়ের করলে ১ বছরের কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।

২০।পারিবারিক আদালত কি?
যে আদালতে পারিবারিক বিরোধীয় বিষয় নিয়ে মামলা পরিচালিত হয়। যেমন- দেনমোহর,ভরণপোষন,অভিভাবকক্ত,দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার,বিবাহ বিচ্ছেদ,সন্তানের হেফাজত ও তত্বাবধান ইত্যাদি তাকে পারিবারিক আদালত বলে।

২১।দেনমোহর কি?
বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য স্বামীরনিকট হতে স্ত্রী শরীয়তের বিধান মতে অর্থ-সম্পদ লাভের অধিকার অর্জন করাকে দেনমোহর বলে। দেনমোহর বিবাহের মূল্য,এটি স্ত্রীর অধিকার এবং স্ত্রীর নিকট স্বামীর ঋণ।

২২।স্ত্রী যদি কোন কারণে স্বামীর তালাক দেয় তখন স্ত্রী দেনমোহর পাবে কি?
হ্যাঁ। স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিলে অথবা স্বামী-স্ত্রীকে তালাক দিলে অথবা উভয়ের সমঝোতায় তালাক কার্যকর হলে স্ত্রী সকল ক্ষেত্রে দেনমোহর পাবে।

২৩।ভরণপোষণ কি?
ভরণপোষণ বলতে স্ত্রীর জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর সংস্থান করাকে বুঝায়। স্ত্রী যতদিন স্বামীর প্রতি বিশ্বস্থ থাকবে এবং স্বামীর যুক্তি সঙ্গত আদেশ নির্দেশ মেনে চলবে স্বামী ততদিন স্ত্রীর ভরণপোষনে বাধ্য থাকবে।

২৪। যৌতুক কি?
বিয়ের পরবর্তী যে কোন সময় বিবাহ বলবত থাকাকালীন এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষকে পণ দাবী ও দেয়া নেয়ার ব্যবস্থা হল যৌতুক।

২৫।১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের যৌতুক দাবীর শাস্তি কি?
কোন ব্যক্তি যদি যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান করে অথবা গ্রহণে কু-প্ররোচনা দেন তাহলে সে অনধিক পাঁচ বছর তবে কমপক্ষে ১ বছর কারাদন্ডে বা জরিমানায় অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।

২৬।নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধিত ২০০৩ এর অধীন যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যার শাস্তি কি?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ আইন সংশোধনী ২০০৩ এ যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর জন্য শাস্তির বিধান করা হয়েছে। যৌতুকের জন্য হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড অথবা এ ধরনের চেষ্টার জন্য যাবতজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে এবং উভয় ক্ষেত্রে উক্ত দন্ডের অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবে।

২৭।বাল্য বিবাহ কি?
বাল্য বিবাহবলতে বুঝাবে,যে বিবাহের পক্ষদ্বয়ের যে কোন একজন শিশু। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ এর বিধান মতে,২১ বছরের নিচে কোন ছেলে এবং ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তা বাল্য বিবাহ বলে গন্য হবে।

২৮।বাল্য বিবাহ সম্পাদনের শাস্তি কি?
বাল্য বিবাহ অনুষ্ঠান বা সম্পাদন করলে বা অনুষ্ঠানের নির্দেশ দিলে তিনি ১মাস পর্যন্ত কারাদন্ড বা ১০০০ টাকা জরিমানা বা ঊভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। এক্ষেত্রে পক্ষদ্বয়ের অভিভাবকগনও একই শাস্তি পাবেন।

২৯।অপহরণ কি?
একজন মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক একস্থান হতে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়াকে অপহরণ বলে।

৩০।নারী ও শিশু অপহরণের শাস্তি কি?
যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে নীতি বিগর্হীত কাজ ব্যতিত অন্য কোন উদ্দেশ্যে অপহরণ করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা অন্যূন ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডে দণ্ডিত হবে। (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধনী ২০০৩ মতে)

৩১।সংবাদ মাধ্যমে নির্যাতিত নারী শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে কি?
না,কোন অবস্থাতেই প্রকাশ করা যাবে না। নির্যাতিত নারী শিশুর পরিচয় সংবাদ বা তথ্য এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করতে হবে যাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।

৩২।নির্যাতিতা নারী শিশুর পরিচয় প্রকাশের শাস্তি কি?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর বিধান মতে নির্যাতিতা নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশ কারী দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ প্রত্যেককে অনধিক ২ বছর কারাদন্ড বা অনুর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে।

৩৩।কত বছরের শিশু কোন অপরাধ করলে আইনের চোখে অপরাধী হবে না?
শিশু আইন অনুযায়ী ৯ বছর বয়স পর্যন্ত কোন শিশু অপরাধ করলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

৩৪। পর্ণোগ্রাফী এ্যাক্ট কি এবং এর শাস্তি কি?
পর্ণোগ্রাফী নিয়ন্ত্রণ আইন – ২০১২ এর ৮ (১) এর আইন ও শাস্তি:
(১) কোন ব্যক্তি পর্ণোগ্রাফী উৎপাদন করিলে বা উৎপাদন করিবার জন্য অংশগ্রহনকারী সংগ্রহ করিয়া চুক্তিপত্র করিলে অথবা কোন নারী,পুরুষ বা শিশুকে অংশগ্রহন করিতে বাধ্য করিলে অথবা কোন নারী,পুরুষ বা শিশুকে কোন প্রলোভনে অংশগ্রহন করাইয়া তাহার জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্থির চিত্র,ভিডিও বা চলচ্চিত্র ধারন করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং উপরোক্ত অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ০৭ (সাত) বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ২,০০,০০০/ (দুই লক্ষ) টাকা জরিমানা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন।
(২) কোন ব্যক্তি পর্নোগ্রাফীর মাধ্যমে অন্য কোন ব্যক্তির সামাজিক বা ব্যক্তি মর্যাদা হানি করিলে বা ভয়ভীতির মাধ্যমে অর্থ আদায় বা অন্য কোন সুবিধা আদায় বা কোন ব্যক্তির জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে ধারণকৃত কোন পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তিকে মানসিক নির্যাতন করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড এবং ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।
(৩) কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্ব্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ড এবং ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবে।
(৪) কোন ব্যক্তি পর্ণোগ্রাফি প্রদর্শনের মাধ্যমে গণউপদ্রব সৃষ্টি করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গন্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ২ (দুই) বৎসর সশ্রম কারাদন্ড এবং ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন।

One comment

  1. অনেক কিছু জানতে পারলাম পুরোটা পড়ে। আরও জানার ইচ্ছে রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*