শনিবার , ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত

মুসলিম আইনে দেনমোহর

জানুয়ারি ২২, ২০১৩

এ্যাডভোকেট আজমেরী মোশারফ সুমী:

দেনমোহর (মোহর) হইল কিছু টাকা অথবা অন্য কোন সম্পত্তি যাহা স্ত্রী স্বামীর নিকট হইতে বিবাহের মূল্যস্বরূপ পাইবার অধিকারী হয়, [বেইলী ৯১] এখানে মূল্য শবদটি ঠিক চুক্তি আইনে ব্যবহৃত শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয় না।
মুসলিম আইনে দেনমোহর স্ত্রী প্রতি সম্মান প্রদর্শন হিসাবে স্বামীর উপর আরোপিত একটি দায়িত্ব মাত্র।

muslim law১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের ১০ ধারা মোতাবেক, দেনমোহর পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকিলে স্ত্রীর তলব মাত্র সম্পর্ণ টাকা পরিশোধ করিতে হইবে। স্ত্রীকে তালাক দিবার ব্যাপারে স্বামীকে প্রতিশ্র“ত যাবতীয় অর্থ প্রদান করিতে হইবে এবং প্রতিশ্র“ত অর্থের পরিমাণ অনেক বেশী কিংবা স্বামীর পরিশোধ ক্ষমতার বাহিরে, এই যুক্তিই স্ত্রী দাবীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব নহে। কিন্তু [বেইলী-২য়, ৬৭) অনুযায়ী শিয়া আইনে দেনমোহরের সর্বনিম্ন কোন অর্থ নির্দিষ্ট নাই।

“ন্যায্য” দেন মোহর (মোহর-ই-মিছিল): দেনমোহরের পরিমাণ যদি নির্দিষ্ট করা না হইয়া থাকে, স্ত্রী দেনমোহর নির্ণয় কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য মহিলা। সদস্যর ক্ষেত্রে যেমন, তাহার পিতার ভগ্নিনীর ক্ষেত্রে, দেনমোহরের পরিমান কত ছিল তাহা বিবেচনা করিতে হইবে। [হেদায়া, ৪৫, বেঈলী-৯২]

দেনমোহর নিশ্চিত হয় দাম্পত্য মিলন দ্বারা, বৈধ অবসর, স্বামী অথবা স্ত্রীর মৃত্য দ্বারা, কিন্তু শিয়া আইনে কিছুটা ব্যাতিক্রম রয়েছে, দাম্পত্য মিলন , অথবা পক্ষদ্বয় যে কোন একজনের মৃত্যর মৃত্যর ফলে দেনমোহরের অধিকার প্রতিষ্টিত হয়। একটি বিষয় না বললেই না স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক দিলে দেনমোহরের পরিমাণ অর্ধেক হইবে। কিন্তু দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্বামীর মৃত্যু হইলে স্ত্রীকে সম্পূর্ণ দেনমোহরে প্রদান করিতে হইবে।

দেনমোহরের বাবদ দেয় অর্থকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। “তাৎক্ষনিক” যাহা চাহিবামাত্র পরিশোধযোগ্য এবং অপরটি “বিলম্বিত” দেনমোহর-যাহা মৃত্য অথবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ পরিশোধযোগ্য।

দেনমোহরের মামলা ও তামাদী আইনঃ- স্ত্রী, তাহার, দেনমোহরের টাকা না পাইলে, সে এবং তাহার মৃত্যর পর তাহার উত্তরাধিকারীগণ, উহার জন্য মামলা দায়ের করিতে পারে তাৎক্ষনিক দেনমোহর আদায়ের মামলা দায়ের করিবার সময় সীমা হইল দেনমোহরটি দাবী ও উহা প্রদানে অস্বীকৃতির তারিখ হইতে তিন বছর, অথবা যেখানে বিবাহ থাকাকালীন এই জাতীর কোন দাবীই উস্থাপিত হয় নাই, সেখানে মৃত্য কিংবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিলে, তখন পর্যন্ত ১৯০৮ সালের তামাদী আইন, তফসীল-১, অনুচ্ছেদ-১০৩ “বিলম্বিত” দেন মোহরটি আদায়ের সময় সীমা হইল মৃত্য অথবা তালাকের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিলে ঐ তারিখ হইতে তিন বৎসর [তফসীল-১, অনুচ্ছেদ-১০৪] “বিলম্বিত” দেনমোহরের দাবীতে স্বামীর সম্পত্তি বিধবার বৈধ দখলে থাকাকালীন তামাদীর মেয়াদ বিধবার বিপক্ষে যাইতে না, স্ত্রী লিখিতভাবে তালাক প্রাপত হইলে, তামাদী আইনের ১০৩ ও ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্ত্রীকে উক্ত লিখিত তালাক দানের তথ্য বা সংবাদটি অবগত করিবার তারিখ হইতেই তামাদীর সময় শুরু হইবে আদায়ের দাবীতে মামলা দায়ের করিবার অধিকার স্ত্রী রহিয়াছে।

অপরিশোধিত দেনমোহর একটি ঋণ এবং নীতিটি হইল এই যে, অধমর্ণ উত্তমর্নকে অনুসন্ধান করিবে। অতএব, স্ত্রী থাকিলে ও স্বামীর ঠিকানা জানানো থাকিলে স্ত্রী বাসস্থানটি যে আদালতের আত্ততাভূক্ত, স্ত্রী সেখানেই মামলাটি দায়ের করিতে পারিবে, বিখ্যাত মামলা তুলনা দিতে পারি এই ক্ষেত্রে শাহ বানু বেগম বনাম ইফতেখার মাহমুদ খান (1957) 2 WP 748, (56) P, kar, 363

অত্ররাধিকারীগণের দেনমোহর ঋণের দায়ঃ- মৃত মুসলমানের উত্তরাধিকারীগণ দেনমোহর ঋণের জন্য ব্যক্তি গতভাবে দায়ী নহে। মুসলিম আইনে ৪৩ ধারা অনুযায়ী মৃত্যের নিকট প্রাপ্য অনগদ ঋণের ন্যায়-দেনমোহর ঋণের উত্তরাধিকারীর মৃত্যের সম্পত্তিতে প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে প্রত্যেক উত্তরাধিকারী দায়ী হইবে।

সুতরাং বিধবা স্ত্রী দেনমোহরের দাবীকে তাহার স্বামীর সম্পত্তির দখলে থাকিলে তাহার স্বামীর অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণ সম্পত্তিতে নিজ নিজ প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে দেনমোহর ঋণ পরিশোধ করিবার পর পৃথক ভাবে স্ব স্ব অংশ উদ্ধার করিতে পারিবে।

বিধবার দেনমোহরের পরিবর্তে স্বামীর ভূসম্পত্তি স্বীয় দখলে রাখিবার অধিকারঃ- মুসলিম আইনে ধারা ২৯৬ এই বিষয়টি পর্যালোচনা হয়েছে। বিধবার দেনমোহরের দাবী তাহাকে তাহার স্বামীর কোন সুনির্দিষ্ট সম্পত্তিতে কোন “চার্জ” সৃষ্টির অধিকারী করেনা। কিন্তু যখন তাহার “দেনমোহরের পরিবর্তে” সে প্রতারণা ব্যাতিরেকে এবং “বৈধভাবে” তাহার মৃত স্বামীর সম্পত্তি লাভ করিয়া এবং উহার দখলে থাকিবে, সে তাহার দেনমোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তাহার স্বামীর সম্পত্তি নিজ দখলে রাখিতে পারিবে। অর্থাৎ এই যুক্তিতে বলা যায় যখন সে দখলে থাকিবে সম্পত্তিতে আয় হইতে যে দেনমোহরের পাওনা আদায় করিবে। একটি বিষয় না বললে নয় তা হল বিধবা তাহার প্রাপ্য দেনমোহরের পরিবর্তে তাহার মৃত স্বামীর ভূ-সম্পত্তি নিজ দখলে আনে নাই, যে তাহার স্বামীর অন্যান্য উত্তরাধিকারীগণকে উহার দখল লাভে বাধঅ দিতে পারে না।

মুসলিম আইনে ৩০৩ ধারায় বিধবা দেনমোহরের দাবীতে স্বামীর সম্পত্তিতে দখলভোগী থাকা কালীন অন্যায়ভাবে উহা বেদখল হইলে দখল উদ্ধারের জন্য মামলা অবশ্যই ছয় মাসের মধ্যে দায়ের করিতে হইবে [১৯০৮ সালের তামাদি আইন, তফসিল-১ অনুচ্ছেদ-৩]ব অনুযায়ী। পরি সমাপ্তিতে বলা যায় দেনমোহর ও দেনমোহর প্রদানের নিয়ম, দেনমোহরের সম্পত্তি অধিকার এই বিষয়গুলি মুসলিম আইনে অত্যান্ত সুন্দর ভাবে লিখিত রয়েছে। আইনের ভূল ব্যাখ্যা না দিয়ে ধারনা পোষন না করে যদি সঠিক আইন প্রায়ন করি। তাহলে দেনমোহর বিষয়ে সকল জটিল বিষয়গুলি সমাধান করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*