বুধবার , ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত

সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে

সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার এক বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়নি।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার প্রায় সাড়ে চার বছর পার হয়েছে। তিন বছরে ওই ঘটনার বিচারের দুটি ধাপ অতিক্রম করে। এখন বাকি আপিল বিভাগের চূড়ান্ত বিচার। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হতে পারে।

সুপ্রিমকোর্ট সূত্র জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা শেষে কোনো করনিক ভুল আছে কিনা তাও দেখা হয়ে গেছে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ সদস্য বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ বিদেশ সফর শেষ আগামী সপ্তাহে দেশে ফিরবেন। তাই শিগগিরই রায় প্রকাশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন। এদিকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দিন পার করছেন। গত বছরের ২২ আগস্ট সাত খুন মামলার ডেথরেফারেন্সে ও আপিলের রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, র‌্যাব একটি এলিট ফোর্স এবং মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য এরা বহুবিধ কাজ করেছে।

কতিপয় ব্যক্তির জন্য সামগ্রিকভাবে এ বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। তাদের ভাবমূর্তি নষ্টেরও কারণ নেই। যারা অপরাধী তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
দণ্ড দেয়া হয়েছে। আসামিরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, যদি তারা ছাড়া পেয়ে যায় তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণ আস্থাহীনতায় ভুগবে।

এ খুনের ঘটনায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং সদস্যদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় শুরু থেকেই এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে সংশয় ও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল।

মামলার রায় সেই সংশয় দূর করে। একই সঙ্গে সাতজনকে খুন করে লাশ যে কায়দায় নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিল, সে খবরে দেশবাসী যেমন শিউরে উঠেছিল, তেমনি পরে এ নৃশংস ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের একটি ইউনিটের প্রায় সব সদস্যের যুক্ততার অভিযোগ সবাইকে হতবাক করেছে।
অন্যদিকে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে নাম আসে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের। সবকিছু মিলিয়ে এ খুনের ঘটনাটি একটি চরম সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। এর পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হয় তা দেখতে দেশবাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমি যতটুকু জানি সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা শেষ। ধারণা করা হচ্ছে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রায় প্রকাশ হবে। কত পৃষ্ঠার রায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুনেছি রায়টি সাতশ’ পৃষ্ঠার ওপরে হবে।

শিগগির রায় প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজল যুগান্তরকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সত্যায়িত কপি যাবে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে। রায় প্রকাশের এক মাসের মধ্যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আপিল না করলে রায় কার্যকরের জন্য বিচারিক আদালত সত্যায়িত অনুলিপি কারাগারে পাঠাবে। কারা কর্তৃপক্ষ জেলকোড অনুযায়ী রায় কার্যকর করবেন।

এদিকে রায় ঘোষণার এক বছর পার হলেও এখনও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশিত না হওয়ায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা জানান, রায়ে সন্তুষ্ট হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য তাদের আর কত অপেক্ষা করতে হবে জানা নেই। তবে আদালতের প্রতি তাদের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে বলেও জানান তারা।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন।

তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে উঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি লাশ। নিহত বাকিরা হলেন- নজরুলের বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও চন্দন সরকারের গাড়িচালক মো. ইব্রাহীম।

ঘটনার এক দিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।
আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম হত্যার ঘটনায় ১১ মে একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। এ মামলার বাদী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। পরে দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে পুলিশ।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ এ মামলায় ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। দণ্ডিতদের ২৫ জনই র‌্যাব-১১ তে কর্মরত ছিলেন। মামলার পর তাদের নিজ নিজ বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে যারা কারাগারে আছেন তারা হাইকোর্টে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন। এছাড়া নিু আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য নথিও ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেন।

এরপর প্রধান বিচারপতি এ মামলার শুনানির জন্য ওই বছরের ১৭ মে বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিলে তা কার্যতালিকায় আসে। এরপর ২২ মে থেকে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের করা আপিল শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে ওই বছরের ২২ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

রায়ে বিচারিক আদালতের দেয়া ২৬ জনের মধ্যে র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া নিু আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে দেয়া ৯ জনের সাজা বহাল রাখা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*