ধর্ষণের প্রমাণ বেশি প্রয়োজন নাকি ধর্ষকের শাস্তি?

অক্টোবর ৬, ২০২০ in অপরাধ, আইন-আদালত, কোর্ট প্রাঙ্গণ, ব্লগ, মতামত

ধর্ষণের প্রমাণ বেশি প্রয়োজন নাকি ধর্ষকের শাস্তি?

খবরের কাগজ থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের প্রতিটি মাধ্যমের সবচেয়ে পরিচিত শিরোনামের নাম এখন ধর্ষণ। শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষিতা এবং ধর্ষক এই শিরোনামের প্রধান চরিত্রের নাম। দুঃখজনক হলেও বাস্তব, প্রতিটি ধর্ষণে ধর্ষিতার পরিচয় পাওয়া গেলেও ধর্ষকের পরিচয় পাওয়া যায় হাতে গণা কিছু সংখ্যক। “কে ধর্ষণ হয়েছে” আমরা সেই আলোচনায় যতটনা সময় দেই তার হয়ত অনেকাংশই কম আলোচনা করি “কে ধর্ষণ করেছে” তা নিয়ে। ধর্ষণ এবং ধর্ষক এই দুইটা শব্দ যেন বাংলাদেশের নারীদের কাছে এখন এক মূর্তমান আতঙ্ক, কারণ পরবর্তী ধর্ষিতার ছবি যেন অবচেতন মন নিজের ছবিকেই বারবার দেখায়।

দেশে ধর্ষণের সংখ্যা লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। যারফলে, সাধারণ জনগনের মনেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে,”ধর্ষণের বিচার নেই কেন?” সাধারণ মানুষের এই প্রশ্ন কি অযৌক্তিক না যৌক্তিক তা হয়ত গুরুতর কোন প্রশ্ন না কিংবা এই প্রশ্নের উদ্দ্যেশ্যে কিন্তু বিচারবিভাগ-কেও প্রশ্নবিদ্ধ করেনা। এই প্রশ্নটির উদয় হয়েছে ঠিক তখনি, যখন মানুষ নারীর নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত অভাব অনুভব করেছে। আর এই প্রশ্নটি যে শুধু নারীদের একার তা কিন্তু নয়, বরং নারী-পুরুষ সকলেরই। কারণ, একজন নারী কোন না কোম পুরুষের মা-বোন কিংবা স্ত্রী অথবা কোন আত্বীয়। তাই ধর্ষক পুরুষ হলেও এই কলঙ্কিত পুরুষের বিচার চাওয়া হয় শুধুমাত্র দেশের নারীদের ধর্ষণ কমিয়ে আনার জন্যই।

কোন তরূণী,শিশু,নারী কিংবা অন্য যে কেউ ধর্ষণের শিকার হয় তখন সেই ভুক্তভোগী এবং তার নিকটজনেরা সর্ব প্রথম চেষ্টা করে তাকে বাচানোর জন্য, তারপর যায় ধর্ষকের বিচার চাইতে। কেউ কিন্তু তখন ধর্ষিতার সম্ভ্রম ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেনা, কারণ তা অসম্ভব। কিন্তু সবাই যে চেষ্টাটা করে তা মূলত ধর্ষক-কে উপযুক্ত শাস্তি দিতে, যাতে করে পরবর্তী কোন নারীর ধর্ষণের শিকার না হয়। কিন্তু তবুও কেন এই ধর্ষকদের প্রতিরোধ করা যাচ্ছেনা হয়ত তার শতভাগ সঠিক কারণ বলতে পারবে না, তবে প্রায় সবার আঙ্গুলই যেন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু সাধারণ মানুষেরই নয় বরং, দেশের বড় পর্যায়ের ব্যাক্তিত্বগণ ও এই বিষয়ের সাথে সমর্থণ জানায়। এমনকি গুগুলে যদি “বাংলাদেশে ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ” লিখে সার্চ দেয়া হয় তখনও পর্যন্ত একটাই কারণ খুজে পাওয়া যায়।

কিন্তু বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার আগে যদি একদম সুক্ষভাবে বিষয়টিকে নিয়ে খতিয়ে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের ধর্ষণ সম্পর্কিত যে আইন রয়েছে এবং ধর্ষণের যে সাজা রয়েছে তা থেকে কোন ধর্ষকের রেহাই পাওয়া তো যাবেইনা বরং শাস্তির ভয়ে কেউ হয়ত এরূপ কর্মের কথা ভাবতেও চাইবেনা। কিন্তু এত কিছুর পরেও কেন তার উল্টোটাই হচ্ছে এই প্রশ্ন যেন এখন আতঙ্কের প্রধাণ কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

এবার আশা যাক ধর্ষণ পরবর্তীকালীন বিষয়গুলো নিয়েঃ

কেউ ধর্ষণ হলে, তাকে চিকিৎসা দেয়ার পরে সাধারণত ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, পুলিশ ইনভেস্টিগেশন কিংবা ইনকোয়্যারির মাধ্যমে ঘটনার নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্তকে কোর্টে উঠানো হয় এবং বিবাদী যদি ধর্ষক হিসেবে প্রমাণীত হয় তখনই উক্ত ব্যাক্তি আসামী কিংবা প্রকৃত ধর্ষক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তখন থেকেই শুরু হবে শাস্তি প্রক্রিয়া।

উপরোক্ত বিষয়টি সার্বিকভাবে খুব সহজ একটি প্রক্রিয়া মনে হলেও বাস্তবে কিন্তু পুরাই বিপরীত। কারণ, বিবাদীকে প্রকৃত ধর্ষক হিসেবে প্রমাণ করাটাই বাদীর পক্ষে একটা চ্যালেঞ্জিং ইস্যু হয়ে দাড়ায়।

যখন কোন ধর্ষিতা বাদী হয়ে মামলা করেন তখন তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এমসি কিংবা ফরেন্সিক টেস্ট করা হয় এবং বিভিন্ন আলামতের মাধ্যমে ধর্ষণ নিশ্চিত করা হয়। যদিও একটি ধর্ষণ নিশ্চিত করতে ভিক্টিমকে যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাতে করে ভিক্টিম এর মানসিক অবস্থা বুঝার ক্ষমতা যেন অন্য ভিক্টিম এবং স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ বুঝার ক্ষমতা রাখেনা। কিন্তু শতকিছুর পরেও বিচারপ্রার্থীর কিংবা ভিক্টিমের ধর্ষণের নিশ্চয়তার পাওয়ার সংখ্যাই দাঁড়ায় বেশি।

অপরদিকে, বিবাদী কিংবা আসল ধর্ষক-কে চিহ্নিত করাটা খুব একটা সহজ ব্যাপার হয় না। কারণ, একটি

ধর্ষণের পরে ধর্ষিতার শরীরে ধর্ষণ প্রমানের একাধিক মাধ্যম থাকলেও ধর্ষণকারী ব্যাক্তির কিন্তু এমন কোন শারিরিক অবস্থার পরিবর্তন হয়না যার দ্বারা সহজেই ধর্ষক প্রমাণ করা যায়। ধর্ষক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত ডিএনএ টেস্ট করা হয় যার নমুনা যেমনঃ বীর্জ, দেহকোষ ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয় ধর্ষিতার দেহ থেকে। অথচ, পুরুষের বীর্য বেঁচে থাকে সাধারণত ১২ থেকে ৭২ ঘন্টা।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের পর একটি মেয়ের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হতে যেই সময় লাগে এবং তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা যতটা এলোমেলো হয়ে যায় সেই সময়টুকু ব্যবহার করেই মূলত একজন ধর্ষক আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেঁচে যায়। কারণ, বাংলাদেশের সামাজিক চিত্রের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভিক্টিম ধর্ষণের পর মামলা করতে এবং মেডিকেল টেস্ট অবধি যে সময় ব্যায় হয় তাতে করে ভিক্টিমের বডি থেকে ধর্ষকের রেখে যাওয়া প্রায় সব নমুনাই নষ্ট হয়ে যায়। আর এই নমুনা একবার নষ্ট হয়ে গেলে তখন ধর্ষণের সত্যতা প্রমাণ পাওয়া গেলেও কিন্তু বেশিরভাগ ধর্ষণকারীকেই কে প্রমাণ করা সম্ভব হয়না।

ধর্ষক প্রমাণের আরেকটি উপায় থাকে সাক্ষী। দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি আমাদের দেশের বেশিরভাগ ধর্ষণগুলি এমন জায়গায় হয়ে থাকে যা সাধারণত নির্জন এবং জনমানবহীন হয়ে থাকে। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে তেমন কোন মানুষ চাক্ষুষ সাক্ষীও হয় না। আর যেসব ক্ষেত্রে হাতেগণা কিছু সাক্ষী পাওয়া যায় তাও বিবাদী পক্ষের আইনজীবীর কৌশলী জেরার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাধারণত এই পয়েন্ট এর দূর্বলতাকেই আইনের ফাঁক-ফোকড় হিসেবে ধরা নেই।থাকে। কারণ, এখাণে সবচেয়ে বড়  চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়ায় আসল ধর্ষক কে খুজে বের করা। আর প্রকৃত ধর্ষক সনাক্ত না হলে তাকে বিচারের আওতায়ও আনার উপায় নেই।

 

কোন ধর্ষণ কে ব্যখ্যা করতে গেলে যে বিষয়গুলো প্রধান তা হলঃ ধর্ষণ,ধর্ষক এবং ধর্ষিতা। কিন্তু কোন ধর্ষণের পর আমরা সবার প্রথম জেনে থাকি ধর্ষিতার পরিচয়। শিরোনাম কিংবা খবরের হেডলাইনেও সর্বপ্রথম প্রকাশ করা হয় ধর্ষণ শব্দটি এবং ধর্ষিতার পরিচয়, পরবর্তীতে আসে ধর্ষকের কথা। কারন খুব সহজ, কেননা ভুক্তভোগী ই আওয়াজ তুলতে চায় কিন্তু অপরাধী চায় পালিয়ে বেড়াতে। ধর্ষণের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এর বিপরীত নয়। তাই আমরা “বিচার চাই, বইচার চাই” বলে আওয়াজ ঠিকি তুলে থাকি কিন্তু  বিচার টা কার চাই? অবশ্যই ধর্ষকের বিচাই চাই, কিন্তু ধর্ষককে আমরা চিনব কিভাবে সেই উত্তর কি জানি? তাই ধর্ষক প্রমাণের বিষয়টিও দেখতে হয় আদালতকে, আর ধর্ষক নির্ধারণ ও বিচারের মাঝে পড়ে যায় এক বিশাল দূরত্ব।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষকের সঠিক বিচার না হওয়ার পেছনে আইনের যে দুর্বলতাটি রয়েছে তার কারণ ধর্ষণ সাধারণত একটি ফৌজদারী অপরাধ এবং, ফৌজদারি আইনের দর্শন হলো: এই আইনের অধীনে কোনো মামলা হলে তা সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে শতভাগ প্রমাণ করতে হয়৷ কোনো সন্দেহ রেখে কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না। আসামিরা সব সময়ই ‘বেনিফিট অফ ডাউট’-এর সুযোগ পেয়ে থাকেন। আর বাংলাদেশে ধর্ষনের ক্ষেত্রে শতভাগ শর্ততা কতটা কঠিন তার দুঃখজনক বর্ণনা আমাদের সকলেরই জানা।

 

ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন এবং বিচার সংক্রান্ত জটিলতাঃ

বাংলাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা বর্ণনা করা হয়েছে “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী২০০৩) এর ধারা ৯” এবং “দন্ডবিধির ধারা ৩৭৫”-এ ।

ধর্ষণের শাস্তি সংক্রান্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০” এর ধারা ৯(ক), ৯(খ), ৯(গ) ও ৯(ঘ) তে।

“নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০”-এর অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের লক্ষ্যে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এই ট্রাইবুনালের সংখ্যা ১০১টি এবং ১০১টি ট্রাইবুনালের অধীনে চলমান মামলা প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার।

একটি ধর্ষণ মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে বাদীর ক্ষেত্রে এক পর্যায়ে মামলা চালানোইয় অনেক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় এবং বাদীপক্ষ মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে, বিবাদীর পথ তখন আরও মসৃণ হয়ে যায় এবং সময়ের যথাযথ প্রয়োগ করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।

 

দীর্ঘমেয়াদী মামলা পরিচালনা এবং বাদীর সঠিক বিচার না পাওয়ায় ট্রাইব্যুনালের স্বল্পতা কতটা অন্তরায় তা হয়ত বলার অপেক্ষা রাখেনা।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ২০ ধারা মোতাবেক বিশেষভাবে দ্রুত বিচার করার লক্ষ্যে শুধু ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলবে।

২০(২) উপ-ধারা মোতাবেক ট্রাইব্যুনাল প্রতি কর্মদিবসে একটানা বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশনা আছে।

২০(৩) উপ-ধারা মোতাবেক ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পাদনের নির্দেশনা থাকলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছেনা। প্রায় প্রতিটি জেলাতেই ট্রাইবুনালে যে পরিমাণে মামলা হয় সেই তুলনায় বিচারকের স্বল্পতা থাকায় মামলা জট হওয়ার একটি অন্যতম কারণ।

 

এই স্বল্পতাসত্বেও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আলোচিত কিছু মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করেছে উক্ত ট্রাইবুনালটি,যা সাধারণ মানুষের মনে নিঃসন্দেহে অনেক্ষানি আশার দুয়ার।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একের পর এক ধর্ষণ এবং নারীদের নিরাপত্তা এখন সময়ের চাহিদা । আমাদের দেশের আইন প্রতিবেশীদেশ ভারতের আইনের চেয়ে অনেক শক্তিশালি ও কার্যকর। তবুও বেড়েই চলছে ধর্ষণের সংখ্যা। বছর বছর ধর্ষণ বৃদ্ধির হার শিউরে উঠার মত।

দেশের যুবসমাজ,নারী,শিশু সকলকেই রাস্তায় নেমে ধর্ষকের বিচার চাইতে হচ্ছে আজ, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইতে হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিচারব্যবস্থা।

একটি চরম বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের দেশে একটি উন্নত ও কার্যকরী আইন থাকার পরেও জনমনে তা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে শুধুমাত্র প্রয়োগের অভাবে।

বর্তমানে যে হারে ধর্ষণ বাড়ছে তার প্রতিরোধে সর্রবপ্রথম প্রয়োজন “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০” এর যথার্থ প্রয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাইবুন্যাল এবং পাশাপাশি সরকারিভাবে স্পেশাল চৌকশ টীমের সমন্বয়, যার মাধ্যমে দ্রুত ধর্ষক নির্ধারন সহজ  হবে এবং প্রয়োজনে কোন মামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে যাতে করে কোন ধর্ষক অন্ততপক্ষে সাক্ষীর অভাবে পার পেয়ে না যায়।

 

মুবিন হাসান খান  অয়ন: শিক্ষার্থী; আইন বিভাগ, জেড. এইচ. সিকদার ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি।

কিশোর অপরাধের অনলাইন মাধ্যম ও বাস্তব সমাজে তার প্রভাব

আগস্ট ৯, ২০২০ in অনিয়ম, সদ্যপ্রাপ্ত, সর্বশেষ সংবাদ

কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধ এখন অতিপরিচিত একটি শব্দ। তাছাড়া কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে কিছু বিকৃত চর্চার কিশোর এবং তাদের কার্যক্রম এতটাই আলোচিত হয় যাতে করে এদের থামানোর ব্যবস্থা না করলেই নয়।

সম্প্রতি গণমাধ্যম টিকটক এবং লাইকি নামের দুইটি এপ্স খুবই আলোচিত হচ্ছে। যেই এপ্সের ইউজাররা ভিডিও করে এডিট করে পরে তা আপ্লোড করে। কিন্তু সেই আপ্লোড আর টিকটক কিংবা লাইকি এর ভিতর সীমাবদ্ধ থাকেনা। তার বিচরণ চলে যায় ফেসবুকের মত বৃহত্তর গণমাধ্যমে। আর সেই ভিডিওগুলোর না আছে কোন মার্জিত স্ক্রীপ্ট না আছে কোন গল্প কিংবা অভিনেতাদের কোন শালীন ভঙ্গী। কয়েক সেকেন্ডের ভিডীও বানিয়ে রাতারাতি বনে যাচ্ছে কথিত সেলিব্রিটি। নিজেদের সংস্কৃতি বর্জন করে তারা টেনে আনছে অন্য দেশের সংস্কৃতি, বাড়ছে অশ্লীলতা এবং ক্ষুন্ন হচ্ছে নিজ দেশের মান।

 

কিছুদিন আগে এই ভিডিও করা কথিত সেলিব্রেটিদের কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনাও প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ঢাকার গুলিস্তান, ৩০০ ফিট ও উত্তরায় টিকটক এবং লাইকি ভিডিও তৈরি করতে যেয়ে মারামারির মত ঘটনাও ঘটে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার ভিডিওর মাধ্যমে পক্ষ-বিপক্ষ পাল্টা জবাব দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। প্রশ্ন জাগে কারা করছে এসব অপ্রয়োজনীয় ভিডিও? কি তাদের উদ্দেশ্য?

লাইকি/টিকটক সেলিব্রেটিদের মধ্যে ইদানিং সবচেয়ে বেশি নাম আসে “প্রিন্স মামুন” ও “অপু”। বিষয়টি আরও আলোচিত হয় উত্তরার একটি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে কেন্দ্র করে, যেখানে টিকটক অপু ভিডীও বানাতে গিয়ে রাস্তা আটকে ওইখানের স্থানীয় বাসিন্দাদের মারপিট করে এবং পরবর্তীতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ও আদালত তাকে কারাগারে পাঠায়। টিকটক অপু তার নিজ দেয়া নাম ” অপু ভাই” নামে পরিচিত। ফেসবুকে আবার অনেকেই তার মুক্তি চেয়ে পোস্ট ও করেছে।

প্রিন্স মামুন কিংবা অপু এদের বয়স দেখলে বুঝা যায় এখনো তাদের ভিতর পূর্ণাঙ্গ ম্যাচিউরিটির অভাব। কিন্তু এদের ভাবভঙ্গী ও বেশভূষায় বস্তির টোকাইদের ও হার মানায়। একটা সময় টোকাই বলতে রেললাইনে পলিথিনের ভেতর আঁঠা ভরে নেশা করা কিশোরদেরকেই হয়ত বুঝাতো। কিন্তু বর্তমানে লাইকি/টিকটক এর বদৌলতে যেন সেসব টোকাইরাই নতুন করে নিজেদের সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করছে ডিজিটাল মাধ্যমে। এদের পোশাক থেকে শুরু করে চুলের কাট এমনকি কথাবার্তায় ও পাওয়া যায় সেই টোকাইদের ছাপ। বখাটেপানা আর আত্মঘাতী মনোভাবকেই যেন তারা ধরে নিচ্ছে ভাইরাল হওয়ার মাধ্যম হিসেবে। এমনকি সফলতাও পাচ্ছে অনেকেই। কোন মেধার চর্চা কিংবা প্রতিভা ছাড়াই বিকৃত চর্চার মধ্যে বনে যাচ্ছে একেকজন কথিত ছেলিব্রেটি। কেউ কেউ আবার নামের পরে “ভাই” টাইটেল যুক্ত করে হয়ে যাচ্ছে মস্তান কিংবা বড় ভাই। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এদেরকে আবার অনুসরণ করছে সমাজের কিছু উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে।

 

এসব টিকটক কিংবা লাইকি এর প্রভাব যে শুধুমাত্র অনলাইনেই বিচরণ করছে তা নয়, বাস্তব সমাজেও পড়ছে এর চিত্র। লাল/টিয়া/নীল তাদের চুলের কালার, পোষাকের ভেতরেও নেই কোন মার্জিত ছাপ উল্টো চেহারা এবং ভাবভঙ্গি যেন তাদের বখাটে/নেশাগ্রস্ত হিসেবেই পরিচয় করিয়ে দেয়, যাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে আমাদের সমাজের টীনএজরা। এসব এপ্সের যে সকল ভিডিওই নেতিবাচক তেমনটাও নয়,ইতিবাচক ও রয়েছে অনেক ভিডিও কিন্তু আমাদের দেশের যেসব ছেলেমেয়েরাই এই প্লাটফর্ম কে বেছে নিচ্ছে তাদের প্রায় সবাই নেতিবাচক মনোভাব এং কর্মকান্ড এর দ্বারাই আলোচিত এবং সমালোচিত।

 

কিছুদিন আগে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হয় “অপু” নামের এক কিশোর। কারণ হিসেবে উত্তরা মডেল থানার ডিউটি অফিসার এসআই মো. ফুয়াদ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন,

সড়কে একজনকে মারধরের ঘটনায় অপুর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছিল। এই মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ।

শুধু তাই নয় টিকটক/লাইকি তে অপুর ফলোয়ার প্রায় ১০ লাখ ছাড়িয়ে। সেই জনপ্রিয় অপু তার একটি ভিডীও তৈরির জন্য উত্তরার একটি রাস্তা ব্লক করে এবং স্থানীয় এক ব্যাক্তি বাঁধা দিলে সেখানে তার কিছু ফ্যান-ফলোয়ার ও তারমতই কিছু বখাটেদের নিয়েই সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়। অর্থাৎ সেখানে বখাটে অপুর আধিপত্য বিস্তারেরও কিছু মনোভাব ছিল। তাছাড়া অপুর এই ফ্যান-ফলোয়ার কে কাজে লাগিয়ে তাকে আশ্রয়ের জোগান দেয় উত্তরা কিশোর গ্যাং এর ৩ সদস্য। সংবাদমাধ্যমে জানা যায় পুলিশ তার তদন্ত করছে।

 

এভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে এরা সমাজের একটা বড় যায়গা দখল করে ফেলেছে। ইতোমধ্যে এইসব টিকটক/লাইকি সেলিব্রিটিরা এতটাই মিডিয়া কাভারেজ হয়েছে যে সিনহা হত্যার মত এত বড় একটা রাস্ট্রীয় খবর ওইসব খবরগুলোর জন্য ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। অপুদের মত বখাটে গ্রেপ্তার এতটাই আলোচিত এবং জনপ্রিয় যে সোস্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রায় সব যায়গায় এরাই দখল করে নিয়েছে। এভাবে আগাতে থাকলে হয়ত সমাজের একটা বড় অংশই এদের আওতায় চলে আসবে এবং তখন যেমন ভাবমূর্তি নষ্ট হবে মিডিয়াগুলোর ঠিক তেমনি সামাজিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।

একজন কিশোর-কিশোরীর মনে নানাবিধ চিন্তা-ভাবনা আসতে পারে, বয়ঃসন্ধিকালের প্রভাবে এদের মনে অনেক রঙিন স্বপ্ন আসতে পারে। কিন্তু তাদের এইসব রঙিন স্বপ্নগুলি যদি সমাজের নেতিবাচক দিকগুলিকে প্রাধান্য দেয়, তবে সেটা তখন আর শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই নয় বরং সামাজিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা ইতোমধ্যে অনেকক্ষানি প্রভাব ফেলেছেও। মনোবিজ্ঞানীরাও এসবকে নেতিবাচক বলেই ধারণা করে নিচ্ছে।

১৫ সেকেন্ডের একটা ভিডীওর জন্য দেখা যায় একজন শিক্ষার্থীও নষ্ট করছে ঘন্টার পর ঘন্টা, এসব প্লাটফর্ম থেকে পাচ্ছে সস্তা বিনোদন, বাড়ছে অপসংস্কৃতি, নষ্ট হচ্ছে ভবিষ্যত এবং বাংলাদেশে আশংকা বাড়ছে কিশোর গ্যাং এর মত নানাবিধ অপরাধের সংখ্যা।

তাই এসব অপসংস্কৃতি বন্ধে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একিসাথে বন্ধ করতে এদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। কারণ একজন সচেতন ব্যাক্তিও যদি এদের নিয়ে মজার ছলে কোন আলোচনা করে কিংবা সোস্যাল মিডিয়ায় ট্রোল/মিমস বানায় তাহলেও সেসবকে তারা পরিচিতির মাধ্যম হিসেবে ধরে নেয়। তাই এদের নিয়ে যতটা সম্ভব সমালোচনা কিংবা আলোচনা না করার অনুরোধ রইল।

বর্তমানের এই ছোটখাট সমস্যাগুলোকে নিয়ে যদি কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে তা ভবিষ্যতের জন্য আশনি সংকেত। সোস্যাল মিডিয়ার এসব নেতিবাচক প্রভাব যেন বাস্তব জীবনে প্রভাব না ফেলে এবং একিসাথে সোস্যাল মিডিয়াও যাতে সুন্দর পরিবেশের মধ্যে থাকতে পারে এর দায়িত্ব আমাদের সকলেরই নিতে হবে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যেমন যাবেনা একিভাবে কিছু অন্যায় নিয়ে মজার ছলেও অন্যায় বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়া যাবেনা।

লেখকঃ মুবিন হাসান খান অয়ন
সদস্যঃ Progressive Lawyers Union of Shariatpur [PLUS]

 

অনুমতি ছাড়া হাসপাতালে অভিযান করা যাবেনা মর্মে সার্কুলার চ্যালেঞ্জ করে রিট

আর কত গড়ালে চোখের জল, মুক্তি পাবে শিক্ষানবিশদের দল?

জুলাই ২৪, ২০২০ in মতামত, সর্বশেষ সংবাদ

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুমানোর আগ মুহূর্তে যদি এখন বাংলাদেশের আইন-আদালত নিয়ে কোন আপডেট জানার প্রয়োজন হয় তবে সবার আগে চোখে পড়বে আর্তনাদ। গত ৭ দিন ধরে একনাগাড়ে দেখা যাচ্ছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মানববন্ধন, কখনোবা অনশন আবার কখনো কখনো তাদের ভারী হওয়া কন্ঠের সাথে চোখের জল। তাদের দাবী একটাই এবং এর নাম “সনদ”। অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে, “একটা সনদের এমন কি প্রয়োজন যার জন্য রাস্তায় নামতে হবে?” অনেকের কাছে এই প্রশ্ন নতুন হলেও এর উত্তর অনেকের কাছেই বেশ পুরান। পার্থক্য হচ্ছে, সড়কে নামার আগে অনেকেই এই সনদ সম্পর্কে জানতনা এবং তাদের বিপরীতে একদল এই সনদের গুরুত্ব বুঝে তা আদায়ের জন্য আজ রাস্তায়।

 

আইনজীবী সনদ লাভের পেছনে সাধারণত ২টি কারণ থাকে,

প্রথমতঃ আইনজীবী হিসেবে নিজের পরিচয়।

দ্বিতীয়তঃ আইনপেশায় নিয়োজিত হয়ে কাজ করার জন্য।

আইনজীবী হওয়ার পুর্বশর্ত হচ্ছে একজন ব্যাক্তিকে দুই বছর কিংবা চার বছর মেয়াদী আইন বিষয়ের উপর ডিগ্রী থাকতে হবে। তারপর ৬ মাস একজন সিনিয়র আইনজীবীর সাথে প্রাক্টিস করবে যিনি কমপক্ষে ১০ বছর ধরে আইনজীবী হিসেবে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আইনের ডিগ্রী হাতে পাওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী যখন কোন সিনিয়রের অধীনে কাজ করে তখন তাকে বলা হয় শিক্ষানবীশ আইনজীবী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী থেকে পরিপূর্ণ আইনজীবী হওয়ার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানের নাম “বার কাউন্সিল পরীক্ষা”। আর ঠিক এই মাঝামাঝি অবস্থানের বলি হতে হচ্ছে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের। কারণ, এই পরীক্ষায় পাশ করলেই কেবল আইনজীবী হিসেবে নিজের পরিচয় বহন করা যায়। তবে এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয় ৩টি ধাপেঃ

১) প্রিলিমিনারী

২) লিখিত

৩) ভাইবা

নিয়মানুসারে এই পরীক্ষা বছরে দুইবার হওয়ার কথা, সম্ভব না হলে অন্তত একবার। কিন্তু বর্তমানে দুটি পরীক্ষার মাঝামাঝি সময় ২-৩ বছর।

এত দীর্ঘ সমইয়ের বিরতির ফলে আইন ডিগ্রীধারীদের যে চাপ সৃষ্টি হয় এবং এর ফল কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে তা নিয়েই মূলত লেখাটির তৈরি। কারণ সাধারণত অনেকেই “আইনজীবী সনদ” এর মর্ম না বুঝার কারণে কিংবা আন্দোলনত শিক্ষার্থীদের করুন আর্তনাদ অনুধাবন করতে না পারায় প্রায়ই তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে থাকেন এবং ব্যাক্তিগত আঘাত হানে এমন মন্তব্য ও করে বসেন। কিন্তু এটা নির্মম এক বাস্তবতা যে একজন ডিগ্রিধারী দীর্ঘ সময় ব্যায়ে ডিগ্রী অর্জন স্বত্তেও নিয়মিত পরীক্ষার অভাবে তার কাঙ্খিত রাস্তায় পৌছতে পারছেনা। এই বিষয়টাকে আপনারা যারা হাস্যরস হিসেবে নিচ্ছেন, ধরুনঃ আপনার ঘরে খাবার দরকার,তাই বাইরে থেকে খাবার এনে তারপর ঘরের সকলের অন্নের চাহিদা মেটাতে হবে। আপনার হাতে টাকাও আছে এবং দোকানে যাতায়াতের জন্য যানবাহনও আছে কিন্তু, আপনাদের এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে কোন দোকান খুলেনা এমনকি যেই রাস্তা দিয়ে দোকানে যাবেন সেই রাস্তাটিও যাতায়াত উপযোগী নয়। এখন আপনি চাইলেই কি আপনার পরিবারের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারবেন? যেখানে অন্য এলাকায় সব স্বাভাবিক চলছে সেখানে আপনার বেলায় যদি এমন হয় তবে কেমন লাগবে কখনো ভেবছেন ?

 

ঠিক একিভাবে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও খাদ্যের যায়গায় দরকার সনদ, যানবাহনের মত তাদেরর আছে ডিগ্রি। কিন্তু দোকানে যাওয়ার রাস্তার মত অবস্তায় ভবিষ্যত এবং দোকানের অনির্দিষ্ট সময়ের মত অনির্দিষ্ট হয়ে আছে বার কাউন্সিল পরীক্ষার সময়। অন্যান্ন এলাকার সময়ের নির্দিষ্টতার মত অন্যান্ন সেক্টরের পরীক্ষাগুলো ও হচ্ছে সময়মত। যেমনঃ বি.সি.এস, এম.বি.বি.এস., বি.জে.এস., ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা বা অন্যান্ন পরীক্ষাগুলো। তবুও আইনজীবী সনদের জন্য নির্ধারিত এই গুরুত্বপূর্ন পরীক্ষাটি কেন সময়মত হচ্ছে না? রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হচ্ছেন আইনজীবীগণ, অথচ একজন নাগরিক যদি রাষ্ট্রে তার অবস্থান প্রথম করার জন্য যৌক্তিক আন্দোলন করে তাহলে কেন তারা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ? পাঠকের কাছে আমার প্রশ্ন রইল। সময়মত পরীক্ষার দাবী প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ না থাকলেও প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় বার কাউন্সিল ,কারণ কেন সময়মত পরীক্ষা নিতে ব্যর্থ হতে হচ্ছে সংস্থাটি?

একজন শিক্ষার্থী যখন অনার্সে ভর্তীর সময় নিজ পছন্দে সাব্জেট হিসেবে ল’ সেলেক্ট করে তখন একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারের হওয়ার স্বপ্নের মত একজন স্বনামধন্য আইনজীবী হিসেবে নিজের স্বপ্নবীজ বুনতে শুরু করে । কিন্তু বীজগুলো বৃক্ষে রুপান্তরিত হওয়ার সময় যখন অনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে তখন স্বপ্নগুলোও দিশেহারা হয়ে পড়ে। একজন স্বপ্নবাজ কে যখন চার বছরের দীর্ঘ সময় শেষে আইন বিষয়ের উপর ডিগ্রি অর্জন করার পরেও যদি ৩-৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় তাহলে একজন স্বপ্নবাজ কতোটা যন্ত্রনা বয়ে চলছে তা হয়ত কিছুটা হলেও আঁচ করা সম্ভব। কারণ এই দীর্ঘ বেকার সময়টাতে একজন শিক্ষার্থীকে সামাজিকভাবে যেমন ছোট করে তুলে তেমনি ভোগায় হীনমন্যতায়। এভাবেই হয়ত নষ্ট হয় একেকটি উজ্জ্বল স্বপ্ন ও একটি উজ্জ্বলশদের দল?

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুমানোর আগ মুহূর্তে যদি এখন বাংলাদেশের আইন-আদালত নিয়ে কোন আপডেট জানার প্রয়োজন হয় তবে সবার আগে চোখে পড়বে আর্তনাদ। গত ৭ দিন ধরে একনাগাড়ে দেখা যাচ্ছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের মানববন্ধন, কখনোবা অনশন আবার কখনো কখনো তাদের ভারী হওয়া কন্ঠের সাথে চোখের জল। তাদের দাবী একটাই এবং এর নাম “সনদ”। অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে, “একটা সনদের এমন কি প্রয়োজন যার জন্য রাস্তায় নামতে হবে?” অনেকের কাছে এই প্রশ্ন নতুন হলেও এর উত্তর অনেকের কাছেই বেশ পুরান। পার্থক্য হচ্ছে, সড়কে নামার আগে অনেকেই এই সনদ সম্পর্কে জানতনা এবং তাদের বিপরীতে একদল এই সনদের গুরুত্ব বুঝে তা আদায়ের জন্য আজ রাস্তায়।

আইনজীবী সনদ লাভের পেছনে সাধারণত ২টি কারণ থাকেঃ

প্রথমতঃ আইনজীবী হিসেবে নিজের পরিচয়।

দ্বিতীয়তঃ আইনপেশায় নিয়োজিত হয়ে কাজ করার জন্য

আইনজীবী হওয়ার পুর্বশর্ত হচ্ছে একজন ব্যাক্তিকে দুই বছর কিংবা চার বছর মেয়াদী আইন বিষয়ের উপর ডিগ্রী থাকতে হবে। তারপর ৬ মাস একজন সিনিয়র আইনজীবীর সাথে প্রাক্টিস করবে যিনি কমপক্ষে ১০ বছর ধরে আইনজীবী হিসেবে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আইনের ডিগ্রী হাতে পাওয়ার পর একজন শিক্ষার্থী যখন কোন সিনিয়রের অধীনে কাজ করে তখন তাকে বলা হয় শিক্ষানবীশ আইনজীবী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী থেকে পরিপূর্ণ আইনজীবী হওয়ার ঠিক মাঝামাঝি অবস্থানের নাম “বার কাউন্সিল পরীক্ষা”। আর ঠিক এই মাঝামাঝি অবস্থানের বলি হতে হচ্ছে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের। কারণ, এই পরীক্ষায় পাশ করলেই কেবল আইনজীবী হিসেবে নিজের পরিচয় বহন করা যায়। তবে এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয় ৩টি ধাপেঃ

১) প্রিলিমিনারী

২) লিখিত

৩) ভাইবা

নিয়মানুসারে এই পরীক্ষা বছরে দুইবার হওয়ার কথা, সম্ভব না হলে অন্তত একবার। কিন্তু বর্তমানে দুটি পরীক্ষার মাঝামাঝি সময় ২-৩ বছর

এত দীর্ঘ সমইয়ের বিরতির ফলে আইন ডিগ্রীধারীদের যে চাপ সৃষ্টি হয় এবং এর ফল কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে তা নিয়েই মূলত লেখাটির তৈরি। কারণ সাধারণত অনেকেই “আইনজীবী সনদ” এর মর্ম না বুঝার কারণে কিংবা আন্দোলনত শিক্ষার্থীদের করুন আর্তনাদ অনুধাবন করতে না পারায় প্রায়ই তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে থাকেন এবং ব্যাক্তিগত আঘাত হানে এমন মন্তব্য ও করে বসেন। কিন্তু এটা নির্মম এক বাস্তবতা যে একজন ডিগ্রিধারী দীর্ঘ সময় ব্যায়ে ডিগ্রী অর্জন স্বত্তেও নিয়মিত পরীক্ষার অভাবে তার কাঙ্খিত রাস্তায় পৌছতে পারছেনা। এই বিষয়টাকে আপনারা যারা হাস্যরস হিসেবে নিচ্ছেন, ধরুনঃ আপনার ঘরে খাবার দরকার,তাই বাইরে থেকে খাবার এনে তারপর ঘরের সকলের অন্নের চাহিদা মেটাতে হবে। আপনার হাতে টাকাও আছে এবং দোকানে যাতায়াতের জন্য যানবাহনও আছে কিন্তু, আপনাদের এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে কোন দোকান খুলেনা এমনকি যেই রাস্তা দিয়ে দোকানে যাবেন সেই রাস্তাটিও যাতায়াত উপযোগী নয়। এখন আপনি চাইলেই কি আপনার পরিবারের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারবেন? যেখানে অন্য এলাকায় সব স্বাভাবিক চলছে সেখানে আপনার বেলায় যদি এমন হয় তবে কেমন লাগবে কখনো ভেবছেন ?

ঠিক একিভাবে শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও খাদ্যের যায়গায় দরকার সনদ, যানবাহনের মত তাদেরর আছে ডিগ্রি। কিন্তু দোকানে যাওয়ার রাস্তার মত অবস্তায় ভবিষ্যত এবং দোকানের অনির্দিষ্ট সময়ের মত অনির্দিষ্ট হয়ে আছে বার কাউন্সিল পরীক্ষার সময়। অন্যান্ন এলাকার সময়ের নির্দিষ্টতার মত অন্যান্ন সেক্টরের পরীক্ষাগুলো ও হচ্ছে সময়মত। যেমনঃ বি.সি.এস, এম.বি.বি.এস., বি.জে.এস., ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা বা অন্যান্ন পরীক্ষাগুলো। তবুও আইনজীবী সনদের জন্য নির্ধারিত এই গুরুত্বপূর্ন পরীক্ষাটি কেন সময়মত হচ্ছে না? রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হচ্ছেন আইনজীবীগণ, অথচ একজন নাগরিক যদি রাষ্ট্রে তার অবস্থান প্রথম করার জন্য যৌক্তিক আন্দোলন করে তাহলে কেন তারা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ? পাঠকের কাছে আমার প্রশ্ন রইল। সময়মত পরীক্ষার দাবী প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ না থাকলেও প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় বার কাউন্সিল ,কারণ কেন সময়মত পরীক্ষা নিতে ব্যর্থ হতে হচ্ছে সংস্থাটি?

একজন শিক্ষার্থী যখন অনার্সে ভর্তীর সময় নিজ পছন্দে সাব্জেট হিসেবে ল’ সেলেক্ট করে তখন একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারের হওয়ার স্বপ্নের মত একজন স্বনামধন্য আইনজীবী হিসেবে নিজের স্বপ্নবীজ বুনতে শুরু করে । কিন্তু বীজগুলো বৃক্ষে রুপান্তরিত হওয়ার সময় যখন অনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে তখন স্বপ্নগুলোও দিশেহারা হয়ে পড়ে। একজন স্বপ্নবাজ কে যখন চার বছরের দীর্ঘ সময় শেষে আইন বিষয়ের উপর ডিগ্রি অর্জন করার পরেও যদি ৩-৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় তাহলে একজন স্বপ্নবাজ কতোটা যন্ত্রনা বয়ে চলছে তা হয়ত কিছুটা হলেও আঁচ করা সম্ভব। কারণ এই দীর্ঘ বেকার সময়টাতে একজন শিক্ষার্থীকে সামাজিকভাবে যেমন ছোট করে তুলে তেমনি ভোগায় হীনমন্যতায়। এভাবেই হয়ত নষ্ট হয় একেকটি উজ্জ্বল স্বপ্ন ও একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত ।

বর্তমানে সোসাল মিডিয়ায় সাধারানত প্রচুর নিউজ শেয়ার হয়, মন্তব্যের অপশন থাকায় অনেকেই নানা ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকেন। তবে সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়টি হচ্ছে যখন সেখানে কোন আইনজীবীর নেতিবাচক মন্তব্য চোখে পড়ে। একজন আইনজীবী একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর অভিভাবকের মতন। সেখানে যদি কোন আইনজীবী শিক্ষানবিশদের এই দুর্দিনে পাশে না থেকে বরং নেতিবাচক মন্তব্য করে তবে তা সত্যি ই খুব হতাশার বিষয়। একজন আইনজীবীর এরূপ নেতিবাচক মন্তব্যে তার দুইটি বিষয় খুব স্পষ্টঃ

১) নতুন আইনজীবীর সংখ্যা বাড়লে মেধার প্রতিযোগীতার ভয়।

২) তার ধারণা একজন শিক্ষানবীশ আজীবন সিনিয়রের ফাইল টেনে হেয় হবে।

একজন আইনজীবীর নেতিবাচক মন্তব্য যে তার নেতি চিন্তারই প্রভাব সেকথা কারোই হয়ত বুঝতে বাকি নেই। তবে সার্বিক বিবেচনায় আইনজীবীদের ও উচিত হবে নতুনদের স্বাদরে বরণ করার মানসিকতা তৈরি করা।

শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের মধ্যে একেকজন একেক ধরণের পরিবার থেকে আসে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের সংখ্যাই এখানে বেশি। এদের অনেকেই আবার প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করছে যা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। কিন্তু এতকিছুর পরেও যখন একজন শিক্ষানবীশ আইনজীবীকে বছরের পর বছর পরিচয়বিহীন সিনিয়রের ফাইল টানতে হয় এবং সারাদিন গাঁধাখাটুনি শেষে পারিশ্রমিক হিসেবে নামমাত্র কিছু সম্মানী পায়, যা দিয়ে হয়ত এক বেলার খাবার হয় বড়জোড়। একজন স্বপ্নবাজ মানুষকে যদি প্রতিনিয়ত এরকম তীক্ষ্ণ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে আগাতে হয় তার ফল যে সমাজের জন্য ও ভালো হবেনা তা সবারি জানা আছে। হাজার হাজার মেধাবী আটকে আছে এই সময়ের দীর্ঘায়তনে। জানা নেই এর সমাধান,জানা নেই এর ভবিষ্যত।

শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের বর্তমান অবস্থান যেন পরবর্তী আইনের শিক্ষার্থীদের সতর্ক করছে। যদি এমনিভাবে আগামীদিনগুলো অতিবাহিত হতে থাকে তাহলে হয়ত পরবর্তীতে কোন শিক্ষার্থী আর আইন পাঠ করে ডিগ্রী অর্জনের জন্য সময় ব্যয় করবেনা। ফলস্বরূপ আমরা বর্তমানে আদালত প্রাঙ্গনে নবীন আইনজীবীদের দ্বারা যেসব ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেছিলাম ও আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের জ্ঞানার্জনে আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলাম তা অচিরেই পূর্বের চিত্রে ফিরে যাবে। আদালত চত্বর ভরে উঠবে দালাল শ্রেণীর লোকে, সীমিত সংখ্যক আইনজীবী থাকার সুবিধা ভোগ করবে কিছু অসৎ ব্যাক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হবে ন্যায় বিচার থেকে।

 

বার ও বেঞ্চ একটি পাখির দুটি ডানা হিসেবে পরিচিত। তাই নবীন আইনজীবীরা যদি এত ত্যাগ স্বীকার করে তারপর পরিচয় অর্জন করে ততদিনে হয়ত তাদের সৎ ভাবনাগুলোতেও মরিচা ধরে যাবে। তাই সংলিষ্ঠদের উচিত যত দ্রুত সম্ভব হয় শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের জন্য কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং বিচার ব্যবস্থা অন্ধকারে বিলীন হওয়ার আগেই আলোকিত করা।

 

লেখকঃ মুবিন হাসান অয়ন

সদস্যঃ Progressive Lawyers Union of Shariatpur [PLUS]