বুধবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত

আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ‘স্বাক্ষী নিরাপত্তা আইন’ করা জরুরি

জুন ৯, ২০১৮

বিডি ল নিউজঃ বিশ্বের অনেক দেশের আইনেই স্বাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টি রয়েছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সাক্ষী দিতে এসে বিরোধী পক্ষের চক্ষুশুল হয় অনেকে। আরা নানা রকম নির্যাতন ভয়ভীতিতো আছেই। সাক্ষী গুম হয়ে যাওয়ার নজিরও কম নয়। সংবিধানেও বিষয়ে কোনো বিধান নই। বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামালা থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছেন । কারণ তাদের মামলার স্বাক্ষীরা ভয়ে আাদালতে হাজির হয়ে স্বাক্ষী দিচ্ছেনা । স্বাক্ষ্যর অভাবে রাষ্ট্রপক্ষও আসামীদের বিরদ্ধে অভিযোগহ প্রমাণ করতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছেন । সাক্ষীর নিরাপত্তা না থাকায় তারা বিজ্ঞ আদালতে আসেন না , এমন কি কোন স্বাক্ষ্যও প্রদান করেন না । কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের তেমন কোন মাথা নেই বললেই চলে । স্বাক্ষ্য আইনের কোথাও স্বাক্ষীদের নিরাপত্তা বিষয়ক কোন প্রকার আইনের বালাই নেই । অথচ আদালতে কোন স্বাক্ষী মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিলে তার জন্য আলাদা ভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় ।

আনিচ সাহেব নামে এক ব্যক্তি গাজীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্বাক্ষ্য দিতে আসেন তিনি হচ্ছেন মূল মামলার বাদী । ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে তার ভাই মামুন মিয়া খুন হন তার ব্যবসায়ী প্রতিপক্ষ কামাল খন্দকার এর হাতে । থানায় তিনি একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন । আনিচ সাহেব তার ভাই হত্যার বিচারের দাবিতে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে স্বাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত । মাননীয় বিচারক সাহেব প্রথমতই জিজ্ঞসে করে বললেন , এতদিন কেন আসেননি ? আপনাকেতো আদালতে আসার জন্য বার বার সমন দেয়া হয়েছে । আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেওয়ার পর এলেন কেন ?

বাদী আনিচ সাহেব বললেন , স্যার আমিতো কখনো সমন পাইনি । একথা শুনে মাননীয় বিচারক সাহেব ধমক দিয়ে বললেন আপন ভাই হত্যার বিচার চাইতে আদালতের সমন লাগে নাকি ? আপনি নিজ ইচ্ছায় নিজেই তো মামলার অবস্থা কী হলো তা জানার জন্য আদালতের বারান্দায় ছোটাছুটি করার কথা । বিচারকের ধমক খেয়ে আনিচ সাহেব চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ এবং আদালতের কাছে ক্ষমা চাইলেন । অত:পর তার স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ।

স্বাক্ষ্য দেওয়া শেষ হলে আনিচ সাহেবের সাথে কথা বলে জানা যায় , এই হত্যা মামলা দায়ের করায় আসামী একদিন দলবল নিয়ে তার বাসায় গিয়ে তাকেও হত্যার হুমকি দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করতে বলেন । এমতাবস্থায় , আনিচ সাহেব ভয় পেয়ে কিছুদিন আত্বগোপনে ছিলেন । আসামীদের অব্যাহত প্রাণ নাশের হুমকি ধমকিতে মামলা চলাকালীন বাদী আনিচ সাহেব আদালতে আসেননি কোন খোঁজ-খবর নিতে ।

শওকত ইসলাম (ছদ্মনাম) স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে রাত আনুমানিক ৮ টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন । হঠাৎ ফাঁকা রাস্তার পাশে ২ জন পুলিশ ডাকে তাকে । এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে পুলিশ । শওকত ইসলাম কে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করায় পুলিশ । সেই থেকে তিনি হয়ে গেলেন উক্ত মামলার স্বাক্ষী । তিনিও উপরোক্ত আনিচ সাহেবরে মতই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ছিলেন ।

একটি ঘটনা উল্লেখ করি । ২০০০ সালের ১৪ জুন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে রিংকু নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনায় হীরা নামের এক ব্যক্তিকে একই বছরের ১০ জুলাই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ৩য় আদালতে ২০১২ সালের জুন অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর প্রায় থেকে ১০ বার সাক্ষীদের সমন করা হয়। কিন্তু সাক্ষীরা হাজির হননি। এর মধ্যে আসামীপক্ষ জামিনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন। আবেদনের পর হাইকোর্ট বিভাগ সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপিকে তলব করেন। আদেশ অনুসারে অতিরিক্ত পিপি আসাদুজ্জামান হাইকোর্টে হাজির হয়ে বলেন, আসামি খুব ভয়ঙ্কর। তার ভয়ে কেউ সাক্ষী দিতে আসেন না।

ফৌজদারী মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সুষ্ঠভাবে পরচালনার স্বার্থে স্বাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানে ‘স্বাক্ষী নিরাপত্তা আইন ‘ প্রয়োজন থাকলেও এ ধরনের আইন বাংলাদেশে প্রণীত হচ্ছেনা। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে বাড়ছে ভোগান্তি ।

২০০২ সালে সাবেক অ্যাটর্ণী জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন । এরকম ২০০৬, ২০১১ সালের দিকেও প্রস্তাব পেয়ে মন্ত্রণালয় আইন পরীক্ষা –নিরীক্ষাও করেছিলেন । তবে কালের বিরম্বনায় সেই প্রস্তাব হারিয়ে যায় তলাহীন সাগরে ।

বর্তমানে বাংলাদেশে কেবল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালত আইনে সাক্ষীদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে সেখানে শুধু স্বাক্ষীকে বাড়ি থেকে আনা এবং ট্রাইবু্নাল থেকে বাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দেয়ার বিধান রয়েছে। সে জন্য আইসিটি অ্যাক্ট ২৫-এর সঙ্গে ‘এ’ ও ‘বি’ নতুন দুটি ধারা যোগ করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে, যা এখনো প্রক্রিয়াধীনই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার রম্নলসে স্বাক্ষী ও ভিকটিম সুরক্ষায় বলা হয়েছে, ৫৮ক(১) ট্রাইব্যুনাল স্ব-উদ্যোগে বা কোনো পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাক্ষী অথবা ভিকটিমের সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারের সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশসহ প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারবেন। এই প্রক্রিয়া গোপন থাকবে এবং অন্যপক্ষকে অবহিত করা হবে না। (২) সরকার (ক) স্বাক্ষী অথবা ভিকটিম প্রার্থনা করলে তার বা তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন। (খ) ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা মোতাবেক স্বাক্ষী অথবা ভিকটিমের নিরাপত্তা ও তদারকি নিশ্চিত করবেন; এবং (গ) আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যগণ দ্বারা প্রহরা প্রদানপূর্বক স্বাক্ষী এবং ভিকটিমকে বিচারকক্ষে আনা-নেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। (৩) আইনের ১০(৪) ধারার অধীনে ক্যামেরা কার্যক্রম অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রসিকিউটর এবং ডিফেন্স কাউন্সিলের উভয়ই কার্যক্রমের গোপনীয়তা রক্ষা করবেন মর্মে অঙ্গীকারনামা প্রদান করবেন এবং অনুরূপ কার্যক্রম হতে উদ্ভব কোনো তথ্যাদিসহ স্বাক্ষীর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়।

ফৌজদারী মামলা বিচারের একটি অন্যতম উপাদান হচ্ছে স্বাক্ষী ও স্বাক্ষ্য। স্বাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচারে যেমন বিলম্ব হচ্ছে , তেমনি সত্যিকার সন্ত্রাসী ও দুর্ধর্ষ আসামীরা মামলা থেকে খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাক্ষীর অভাবে ফৌজদারী মামলায় মারাত্বক ন্যায় বিচারের সংকট দেখা যায় আদালতে। পাহাড়সম প্রচুর মামলার স্তুপ জমেছে দেশের বিচারিক আদালত গুলোতে । স্বাক্ষীর অনুপস্থিতি ও আদালতে স্বাক্ষ্য না দেওয়ায় অনেক ফৌজদারী মামলায় প্রমাণ করা যায়না । আইনজীবীরাই বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সন্ত্রাসী আসামীদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষীরা নিরাপত্তাজনিত ভয়ে স্বাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন না ।

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে অপরাধের ধরণ পাল্টে গেছে বহুগুণ। চিহ্নিত , পেশাদার সন্ত্রাসীরা এসব অপরাধের সংগে জড়িত । এদের বিরদ্ধে স্বাক্ষীদের স্বাক্ষ্য দিতে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। তাই দেশে স্বতন্ত্রভাবে অথবা প্রচলিত স্বাক্ষ্য আইনের সাথে নতুন ধারা সংযোজন করে হলেও স্বাক্ষী নিরাপত্তা আইন করা অতীব জরুরি ।

লেখকঃ কামরুল হাসান (নাজমুল)

লিগ্যাল রিসার্চার ও কলামিস্ট

ই-মেইল : khnazmul.law@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*