বুধবার , ১৪ নভেম্বর ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত

ফৌজদারী আইনে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘মুচলেকা’ সময়ের গন্ডিতে আটকানো

জুলাই ৮, ২০১৮

বিডি ল নিউজঃ অপরাধ করলে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হবে এবং তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও আছে, এটাই আইনের বিধান। তবে কোন ব্যক্তিকে যদি অপরাধ সংঘটনের পূর্বেই তা থেকে বিরত রাখা যায় সেটা অবশ্যই মঙ্গলজনক ও সর্বোত্তম ভাল ব্যাপার বলা যায় । সেজন্যই আইনে অপরাধের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মুচলেকার বিধানের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । কিন্তু অপরাধের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে ফৌজদারী আইনে মুচলেকার এই বিশেষ সুন্দর একটি ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডিতে আটকে দেওয়া হয়েছে।
আইনের ছাত্র বা আইন পড়া অনেকেই এখনো মুচলেকার সংজ্ঞা ভালভাবে জানেন না। তাই আগে মুচলেকার অর্থটা একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি । সাধারণত মুচলেকার অর্থ হচ্ছে যে, কোন ব্যক্তির নিকট থেকে এই মর্মে একটি অঙ্গীকার আদায় করা হয়, যেন সে ভবিষ্যতে আর ঐ ধরনের অন্যায় বা অপরাধ করবেনা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বা আওতায় যদি প্রমাণিত হয় যে, সে উক্ত অন্যায় বা অপরাধ করেছে, তবে উক্ত ব্যক্তি বা অপরাধীকে নির্ধারিত দন্ড বা শাস্তি ভোগ করতে হবে ।
কোন অপরাধ বা অন্যায় সংঘটনের পূর্ব মূহুর্তে যদি তা প্রতিরোধ করা যায় সেটাই উত্তম । এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের জন্য ফৌজদারী কার্যবিধিতে কিছু কতিপয় বিধান করা হয়েছে। তবে ফৌজদারী কার্যবিধিতে উল্লেখিত উক্ত কতিপয় বিধান গুলো সময়ের কাঠ গড়ায় আটকে রাখা হয়েছে । যার ফলে একজন অপরাধী মুচলেকার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রম করার পর সে মুচলেকৃত উক্ত অপরাধ পূনঃ সংঘটন করবে না যার কোন নিশ্চয়তা প্রবিধানে নেই । আরো কিছু বলার আগে উল্লেখ করে নিচ্ছি ফৌজধারী বিধানে মুচলেকার সময়সীমা কীভাবে আটকানো হয়েছে সময়ের দেয়াল ঘড়িতে । যেমন , ম্যাজিষ্ট্রেট তার তাঁর এখতিয়ারাধীন এলাকায় বা স্থানে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দন্ডিত আসামী বা অপরাধীদেরকে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৬ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত যে কোন মেয়াদের জন্য বন্ড বা মুচলেকা প্রদানের আদেশ দিতে পারেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৮ ধারা অনুযায়ী জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট বা ম্যাজিষ্ট্রেট কোন রাষ্ট্রদ্রোহীমূলক বিষয় প্রচারকারীকে সদাচরণের জন্য সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদের জন্য মুচলেকা প্রদানের আদেশ দিতে পারেন । ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৯ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট বা ম্যাজিষ্ট্রেট ভবঘুরে বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত সময়ের সদাচরণের বন্ড বা মুচলেকা প্রদানের আদেশ দিতে পারেন। আবার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট বা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট তাঁর এখতিয়ারাধীন এলাকার অভ্যাসগত অপরাধীকে ফৌজদারী কার্যবিধির ১১০ ধারার বিধান অনুসারে তিন বছর অনধিক যে কোন মেয়াদের সদাচরণের জন্য মুচলেকা প্রদানের আদেশ দিতে পারেন ।
অন্যদিকে, শান্তি রক্ষার কার্যক্রমে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭ ধারা নির্দিষ্টভাবেই বলা যায় অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রণীত হয়েছে; অপরাধীর শাস্তি প্রদানের জন্য নয় । অর্থাৎ একটু পরিষ্কারভাবে বলা যায়, আগের সময়ের অপরাধের জন্য এই ধারা শাস্তি প্রদানমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোন অপরাধের উদ্ভব না ঘটে শান্তিভঙ্গ না হয় তা নিশ্চিত করণের লক্ষে প্রবর্তন করা হয়েছে । তবে মূলত ১০৭ ধারায়ও মুচলেকার যে বিধান আছে সেটাও সময়ের নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে অনধিক এক বছরের মাঝেই আটকানো হয়েছে। উপরোক্ত বিধান সমূহ অনুযায়ী মুচলেকা প্রদানে কেউ অস্বীকার করলে ম্যাজিষ্ট্রেট মুচলেকা না দেয়া পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তিকে জেল হাজতে আটক রাখতে পারেন এবং মুচলেকা প্রদানের পর উক্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিয়ে মুচলেকাকৃত সময়ের মধ্যে যাতে পুনঃ অপরাধ না করে তা জানিয়ে দেয়া হয় । তবে নিঃসন্দেহে এটা বলা যায় বন্ড বা মুচলেকার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে আবার একই অপরাধ সংঘটিত হতে পারে । একটি ঘটনা বলি, গাজীপুর জেলার বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭ ধারার আলোকে ২০১৭ সালে মোঃ বোরহান উদ্দিন মামলা করেন তার পাশের গ্রামের দুলাল, সোলাইমান খান ও বাশার এর নামে। মামলার ২য় পক্ষ নিতান্তই দাঙ্গাবাজ, সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী ছিল বটে। মামলার ১ম পক্ষ মোঃ বোরহান উদ্দিন এর সাথে জমি-জমা বিষয়ক কোন্দল থাকায় রাস্তা-ঘাটে দেখা হলেই হুমকি দিত , ভয় দেখাতো। অতঃপর একদিন ২য় পক্ষ মামলার ১ম পক্ষ মোঃ বোরহান উদ্দিন কে রাস্তায় পথ আটকে মারতে আসে। রাস্তার আশে পাশের লোক এগিয়ে আসায় মারতে না পেরে খুন-জখমের হুমকি দেয়ার উক্ত মামলার উদ্ভুদ হয়।পরবর্তীতে ২য় পক্ষ এক লিখিত জবাবে আর ভয়-ভীতি , হুমকি দিবেনা বলে মুচলেকা দেয় বিজ্ঞ আদালতের নিকট। কিন্তু মুচলেকার সময়সীমা পাড় হওয়ার এক বছর শেষ হলেই মামলার ২য় পক্ষগণ মোঃ বোরহান উদ্দিন কে একইভাবে ভয়-ভীতি দেখাতে শুরু করে ।
এমন সময়ের বেঁধিতে আটকে থাকা মুচলেকা নেয়ার ফলে সময় উত্তীর্ণের পর বিগত যে অপরাধের প্রতিরোধকল্পে মুচলেকা বা বন্ড নেয়া হয়েছিল তা সাময়িক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও স্থায়ীভাবে নিবারিত হয়না ।
তাই আমার আইন বিষয়ের ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে বলতে চাই , বন্ড বা মুচলেকার ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধিতে যে সময়ের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে তা উঠিয়ে নিয়ে মুচলেকার মেয়াদ সর্বোচ্চ আমৃত্যু করা ভাল হবে । তাহলে অপরাধীরা একই অপরাধ নতুন করে সংঘটন করার দুঃসাহস দেখাবে না ।

কামরুল হাসান (নাজমুল)
লিগ্যাল রিসার্চার ও কলামিস্ট
ই-মেইল : khnazmul.law@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*