বৃহস্পতিবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ || ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ || ৮ই সফর, ১৪৪২ হিজরি

আইন-আদালত নিয়ে অজ্ঞতার প্রতিঃছবি ও ফলস্বরুপ সাধারণ মানুষের আইন-আদালত সম্পর্কে কিছু বিচিত্র ধারণা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
“আইন পাঠে থাকতে হবে সবার মন
জানতে হবে তাই আইনের প্রয়োজন,
আইন যেখানে সবার জন্য এক সমান
তাই আইন জ্ঞান বাড়াবে নিজ সম্মান।
নিজের অধিকার হবেনা কখনো খর্ব
যদি জানা থাকে আইন করা যাবে গর্ব,
কখনো অজ্ঞতায় হবেনা নিজের ক্ষতি
সর্বদা সচল থাকবে জীবন চাকার গতি।
আমার এই সোনার দেশে শতশত মামলা
অর্ধেক হয় প্রতিশোধ আর অর্ধেকে জ্বালা,
নির্দোষী ঘুরতে থাকে আদালতের বারান্দায়
আর বাদীপক্ষ হাসতে হাসতে আনন্দ পায়।
লোকমুখে চলে আসা কিছু নিছক কথার ভয়
ভয় পায় যদি আইনের মারপ্যাচে পড়তে হয়,
আরো শোনা যায় নির্দোষী পায়না কখনো বিচার
সেজন্য নাকি বেছে নেয় কিছু বেআইনি কারবার।
বলি তুমি পড়েছ কি কখনো আইন দু পৃষ্ঠা
নাকি লোকমুখের শিক্ষাই মিটিয়েছে তেষ্টা?
দূষ্ট লোকে মামলা করেছে, কি করবে ভাবছ
তাই আদলত রেখে মাদবরের কাছে যাচ্ছ।
কিছু কিছু বিষয় আছে জানতে হবে সবার
তা না হলে সমস্যাগুলো পেচিয়ে হবে জট
সব পেরিয়ে যদি আদলতই হয় শেষ দ্বার
তবে কেন করলেনা আসল কাজ ঝটপট?”
উপরের ছন্দটি মূলত আমাদের দেশের সেসব আইন সম্পর্কে অজ্ঞ কিছু ব্যাক্তিবর্গদের তুলে ধরে, যারা কিছু প্রাচীন ভুল ধারণা আর আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আদলতে বিচারপ্রার্থী না হয়ে বিচার বা সমাধান চায় সমাজের কিছু ব্যাক্তির কাছে যাদের কিছুই করার নেই। কিন্তু বেশিরভাগক্ষেত্রেই দেখাযায় যাদের কাছে বিচার চায় তারা তাদের সরলতা আর অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের কিছু টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে কাজ না হলে শেষ আশ্রয় হিসেবে আদালতে ঠিকই যায়, কিন্তু ততক্ষনে ক্ষয়ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়।
আমাদের দেশের একটা বড় অংশকেই এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যার কারণ হিসেবে প্রথমেই যে বিষয়টি মুখ্য তা হচ্ছেঃ আইন কিংবা আদালত সম্পর্কে এদের অজ্ঞতা। সাধারণে আদালত আঙ্গনে যাতায়াত না থাকায় এবং আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকায় বড় অঙ্কের মানুষ আদালতে আসতে চায়না। অনেকে আবার আদালতের নাম শুনলেই ভয় পেয়ে যায়, আর সেই ভয়কে কাজে লাগায় আদালত প্রাঙ্গনের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও দালাল। একেই আদালতে এসে বিচলিত হয়ে পড়ে তার উপর আবার এসব অসাধুদের খপ্পর; এই দুইয়ে মিলিয়ে একটা সাধারণ মানুষ এতই অসহায় পড়ে যে, আদালত প্রাঙ্গণে এসে এইসব ভয়ানক অভিজ্ঞতার দায়ে আদালতকেই দায়ী করে। সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করে ভুল রাস্তায় হেটে চলার নেপথ্যের কারণ অজ্ঞতা হলেও সাধারণত আমাদের দেশে মানুষ এইসব কিছু বাহ্যিক সমস্যার কারণে আদলতকেই জটিল বলে থাকে।
আমাদের সমাজে কিছু অসাধু ব্যক্তি থাকে যাদের কাজ হচ্ছে কাউকে শুধুশুধু হয়রানি করা। আর এই হয়রানি করার জন্য বেশিরভাগই মিথ্যা মামলা করে থাকে। এজলাসে সি.আর মামলা চলাকালীন মাঝেমধ্যেই বাদী আর বিবাদী দুই পক্ষকেই মনে হয় আইনের লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিবেনা। কিন্তু এজলাসের বাইরের গল্পগুলোতে মনে হয়, বিবাদীর সরলতা এবং অজ্ঞতাকে পুঁজি করেই যেন বাদী তাদের আদালতে চক্কর খাওয়াচ্ছে। সেসব মামলার প্রায় বেশিরভাগই দেখা যায় শেষ হয় মীমাংসার মাধ্যমে। বিবাদীর কাছে যখন আদালতের প্রতিটি মুহূর্ত কঠিন হয়ে পড়ে তখনি বাদী তার আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে, বিবাদী যদি তার প্রস্তাবিত অর্থ বা সম্মতিতে  রাজি হয় তখনি বাদী মীমাংসায় যাওয়ার আশ্বাস দেয়। বিবাদীর আদালতের কার্যক্রম সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফলে মামলা সংক্রান্ত ঝামেলা থেকে মুক্তি চায়, তাছাড়া আদালত প্রাঙ্গনে যাওয়ার ফলে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ও কাজ করে। তখন বিবাদী কোন উপায়ন্তর না পেয়ে বাদীর অসৎ উদ্দেশ্যে সম্মতি জানায়। যারফলে, বাদীর অসৎ উদ্দেশ্য সফল হয়। কিন্তু বিবাদী দেখা যায় এসব আইনি ঝামেলা থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে মুক্তি পাওয়ায়, তার এসব বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে সঠিকভাবে বর্ণনা না করে এমনভাবে বর্ণনা করে যেন আদালত বাদীর পক্ষে। যারফলে আদালত সম্পর্কে আরো দশ জনের কাছে একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়।
জি.আর মামলার মতই আবার সি.আর মামলার ক্ষেত্রেও কিছু বিষয় খেয়াল করা যায়। মাঝেমধ্যে দেখা যায় কেউকেউ আদলতে মামলার পরিবর্তে থানায় মামলা করে থাকে। মামলা গ্রহণ এবং আসামীকে কোর্টে চালান করা হলেও আটককৃত ব্যাক্তির পরিবারের লোকজন কোন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ না করেই থানায় সময় নষ্ট করতে থাকে। থানার আশেপাশে প্রায়ই এই চিত্র দেখা যায় আটককৃত ব্যাক্তিকে আদালতে প্রেরণ করা হলেও তার পরিবারের লোকজন থানায় বসে কান্নাকাটি করতে থাকে। তাদের বেশিরভাগের ধারণা এরকম থাকে যে, যেই পুলিশ আটক করেছে তাকে অনুরোধ করলে হয়ত ছেড়ে দিবে। অথবা কখনো কখনো আবার অনেকেই যে ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করে তার কাছে আকুতি-মিনতি করে, অনেকক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ও করে থাকে। ততক্ষনে আটককৃত ব্যাক্তি নির্দোষ প্রমাণ না হওয়ায় ১৪ শিকের মাঝে ঢুকে পড়ে। মামলার এজহারে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবারের লোক কোন আজেবাজে সময় ব্যয় না করে যদি কোন ভালো আইনজীবী নিয়োগ করত তাহলে হয়ত তাকে নির্দোষ প্রমাণ করানোর উত্তম সুযোগ ছিল। কিন্তু আইন-আদালত সম্পর্কে শুধুমাত্র জ্ঞানের অভাবে সোজা রাস্তায় না চলে বরং কঠিন রাস্তায় আগাতে গিয়ে মানুষ নানাবিধ কঠিন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যারফলে অনেক নির্দোষীকেই বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়। সাধারণ কিছু বিষয়ের এই অজ্ঞতার শিকার হতে হয় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এবং তার পরিবারের এই তিক্ত  অভিজ্ঞতার দোষ পড়ে আদালতের। অথচ দেখা যায় আদালতের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন প্রক্রিয়াই অবলোপন করেনি।
আইন সম্পর্কে প্রচলিত অনেক কথাই হয়ত অনেকে বলে থাকে। খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে তাদের বেশিরভাগ মানুষই এসব কথা কিসের ভিত্তিতে বলছে তারা নিজেরাও জানেনা। অথচ, তাদের এসব কথার প্রভাব কিন্তু অনেক বিস্তৃত। এসব বানোয়াট ধারণার অন্যতম কারণ হচ্ছে জনসাধারণের ভেতর তেমন কোন আইন চর্চা নেই। শুধুমাত্র আইন পেশায় নিয়োজিত এবং আইনের শিক্ষার্থীরা ব্যতীত সকলেই  আইন বিষয়ে খুব সীমিত জ্ঞান রাখে যা অনেকটা না রাখার মতই। এই সীমিত জ্ঞানই মাঝেমধ্যে কিছু মানুষের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানুষ অবচেতনভাবে আইন-আদালত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বাহন করায় কোন সমস্যা হলে তারা আইনের যথাযথ প্রয়োগটুকুও করতে পারেনা। যারফলে, তাদের এই নেতিবাচক ধারণা আরও চূড়ান্ত রূপে মোড় নেয় যা সমাজের জন্য একটি ব্যাধি হয়ে দাড়ায়।
“আদালতের ধারে ৭০ বছরের এক বুড়ি দাড়ায়ে
তার একটাই ছেলে যায় জেলে যৌতকের দায়ে,
নিরাশ বুড়ি শুধু ভাবতে থাকে কি কি করা যায়
হঠাৎ এক দালাল এসে বুড়ির কথা শুনতে চায়। 
ভরদুপুরে নিরাশ বুড়ি যেন  আশার আলো দেখে
আঁচল দিয়ে   দুচোখ মুছে আর মুখটা রাখে ঢেকে,
হাত নাড়িয়ে বলতে থাকে তার ছেলে যায় জেলে
একলা বুড়ি বাঁচত এবার শুধু একটু সহায় পেলে।
দালাল তার কথা শুনে কিনল রুটি আর কলা
বূড়ির হাতে দেয় ও বলে কমাও পেটের জ্বালা, 
টাকাকড়ি আনলে তবেই দেখবে ছেলের মুখ
পাঁচদিনে জামিন হবে আর হবেনা তোমার দুখ।
কলা মুখে রুটি হাতেই দাড়িয়ে ভাবছে বুড়ি
ক্ষুধার্তরে খাবার যে দেয় নাই কোন তার জুড়ি,
ছেলেরেও ছাড়ায়া দিবে লাগবে পয়সা-কড়ি
পয়সা নাই লাগবে ছেলে, খুলল সোনার চুড়ি।
চুড়ি দেখে দালাল কেমন মুচকি মুচকি হাসে
আসল নাকি পরখ করেই বসল বুড়ির পাশে,
মুখ ফিরিয়ে দালাল বলে খরচা আছে মেলা
কাল একবার কোর্টে আসেন খুব সকাল বেলা।
এক মাস গেল দুই মাস গেল বছরও প্রায় শেষ
ছেলে যে তার জেলেই আছে দালাল আছে বেশ,
বুড়ি বলে পোলার নামে বৌ করছে মিথ্যা কেস
দালাল বলে ফাইসা গেছে তোমার পোলায় শেষ।
বুড়ি কাঁদে গাছতলায় দুঃখের নাই কোন শেষ
মাছুম পোলায় বৌ পিডানোর খাইল মিছা কেস,
স্বর্ণ গেল টাকা গেল তবু পোলায় জেলে পঁচল
এই দেশের ঐ কোটকাচারি আমায় শেষ করল। “
ছন্দটির দ্বারা এখানে কোর্ট প্রাঙ্গনে দালালের দ্বারা প্রতারিত হওয়া এক বৃদ্ধার শেষ সম্বলটুকু হারানোর আর্তনাদ বুঝানো হলেও এই আর্তনাদ যেন কোর্ট প্রাঙ্গনে ভীর করা হাজার হাজার মানুষের। যদি এই অংশটুকু পর্যালোচনা করা হয় তাহলেও দেখা যাবে যে আইনাঙ্গন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কতটা অজ্ঞ। কবিতায় উল্লেখিত বৃদ্ধার মত এমন অনেক বৃদ্ধাকেই দেখা যায় নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত প্রায় সকল প্রাঙ্গনেই। আর বৃদ্ধার ছেলের মত অনেক ছেলেই জেলের ভেতর অপেক্ষায় থাকে তার জামিনের ঘোষণার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি এমন এক যায়গায় পৌছে যায় যেখানে শুধু ইংরেজী অক্ষর “O” এর মত ঘুরতেই থাকে কিন্তু সমাধান মিলেনা। এই বিষয়টাকে ভাগ্যের পরিহাস বলা যায় নাকি কর্মফল অথবা জ্ঞানহীনতা; সঠিক জানা নেই। তবে এর ভুক্তভোগী যে গণনার বাইরে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
 কিছু কিছু মানুষ ধারণা করে থাকে আইনজীবীরা ঘুষখোর। অথচ আইনজীবীদের নির্দিষ্ট কোন বেতন নেই। একজন আইনজীবী ক্লায়েন্টদের থেকে যেই টাকা নেয় সেটা সম্পূর্ণই তার পারিশ্রমিক। কোন মামলা চালানোর ক্ষেত্রে যদি আইনজীবীর সাথে লেনদেন না মিলে তবে পছন্দমত অন্য আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবে। অপরদিকে ঘুষ বলতে আমরা বুঝে থাকি নির্ধারিত এবং বৈধ বেতন/পারিশ্রমিক এর চেয়ে অসদুপায়ে অতিরিক্ত কোন অর্থ বা উপহার নেয়া। কিন্তু যদি আইনজীবীদের উপার্জনের দিকে তাকানো হয় তবে তাদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্টতা নেই। আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের পরিমান নির্ণয় হবে ক্লায়েন্ট ও আইনজীবীর মধ্যকার সমঝোতার মাধ্যমে। তবুও লোকমুখে প্রায়ই একটা শুনা শুনা যায়, “আইনজীবীরা ঘুষ খায়।” এই কথার প্রেক্ষিতে হয়ত আবারও তাদের অজ্ঞতা এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু কথার ফলাফলকেই দায়ী করা যায়।
 আইনজীবীদের ঘুষ গ্রহণের মত আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের সম্পর্কে। লোকমুখে প্রায়ই একটা কথা শুনা যায়, “আকাশের যত তারা,পুলিশের তত ধারা।” বরাবরের মতই একটা প্রশ্ন তাদের কাছে থেকে যায়, পুলিশ কি আইন তৈরি করতে পারে? আইন তৈরির ক্ষমতা যেখানে শুধুমাত্র সংসদ ও জরুরীভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির রয়েছে সেখানে পুলিশের আইন তৈরির ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই নেই। পুলিশ পারে আইনের প্রয়োগ করতে, তবে তা প্রচলিত আইনের বাইরে নয়। অথচ কিছু মানুষ পুলিশকে অনেক সময় আইন প্রণেতা হিসেবেও জেনে থাকে, যা একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। সেক্ষেত্রে যদি কেউ পুলিশ হয়রানীর কথা বলে, তবে সেটি অন্য বিষয় এবং এর সাথে আইন তৈরির কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া শুধু পুলিশ নয় একজন সাধারণ মানুষও চাইলে আরেকজনকে হয়রানীর স্বীকার করতে পারে মিথ্যা মামলা দায়েরের মাধ্যমে যদি সে অসৎ মনোভাবী হয়, যেই হয়রানীর কথা উপরে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। যদি কেউ কোনরূপ হয়রানীর স্বীকার হয় তবে সেক্ষেত্রে কোনভাবেই আইনকে দোষারোপ করা যাবেনা, দোষারোপ করতে হবে সেই ব্যাক্তিকে যে আইনের ধারাকে কাজে লাগিয়ে মিথ্যা মামলা করেছে। কারণ, আইন নিজে কিছুই বিবেচনা করতে পারেনা আর বিবেচনা করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা শুধু মানুষকেই প্রদান করেছেন।
বিষয়টি দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশের প্রতিটি আদালতপ্রাঙ্গনেই কিছু অসাধু ব্যাক্তিরা এমনভাবে পদচারণা করছে যাতে করে তাদের খপ্পরে পরে কিছু সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষ। তাছাড়া আদালতে কর্মরত কিছু অর্থলোভী ব্যাক্তিবর্গের সহযোগীতায় দালাল শ্রেণীর কিছু কীট বিচারপ্রার্থী মানুষ ও বিচারব্যবস্থার মাঝামাঝি কন্টকের মত অবস্থান করে আছে। আদালত প্রাঙ্গনের এই সমস্যা ততদিন পর্যন্ত সমাধান হবেনা যতদিন পর্যন্ত না সাধারণ মানুষ আইন ও নিজের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাবে এবং তা প্রয়োগ করার সঠিক মাধ্যম বুঝতে পারবে। কারণ, সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে গেলে তাদের পুঁজি করে অসাধু ও দালাল শ্রেণীর লোকেদের আর কিছুই করার থাকবেনা।
আদালতে উঁচু শ্রেণী থেকে নিচু শ্রেণীর প্রায় সবাইকেই কোন না কোন কাজে যেতে হয়। তবে জীবন যাপনের জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতাতার মানুষের যতটা প্রয়োজন ততটা প্রয়োজন আদালতের ক্ষেত্রে হয়ত হয়না। তাছাড়া অনেকেই ভেবে থাকে থানা এবং কোর্ট শুধু অপরাধীদের জন্যই, তাই ভালো মানুষ এসব যায়গায় যায়না। কিন্তু আমরা একটা কথা হয়ত ভুলে যাই, যদি আমরা সচেতন না হয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে থানা কিংবা আদালতের সহায়তা না নেই তবে অপরাধীরাই দিনশেষে পার পেয়ে যাবে। তাই অন্তত নিজের কর্তব্যবোধ থেকে হলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া উচিত এবং তার জন্য প্রয়োজন আইন-আদালত সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান।
আমাদের দেশে আইনচর্চা খুবি সীমিত। প্রয়োজন ছাড়া কেউ হয়ত আইন সম্পর্কে জানার দরকার আছে বলেও মনে করেনা। অপরদিকে আমাদের শিক্ষাঙ্গনে ডিগ্রী অর্জন ব্যাতিত কোথাও আইনের কোন পুস্তক পড়ানো হয়না। আইন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য সরকারি কিছু ব্যবস্থা বাদে তেমন প্রচারণাও নেই। কখনো কখনো ব্যাক্তিগত উদ্যোগে কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন আইনজীবী অসহায়/দরিদ্রদের আইনি সেবা দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশের কিছু মানুষ মাঝেমধ্যে এতটাই অজ্ঞ থাকে যে সরকারী আইনী সহায়তা পাওয়ার যেই মাধ্যম সেই বিষয়টি পর্যন্ত জানে না। অজ্ঞতার ফলে নিম্নস্তরের মানুষ ভেবে থাকে তাদের জন্য হয়ত এদেশে কোন বিচার ব্যবস্থা নেই অথচ অন্যদিকে “লিগ্যাল এইড” প্রতিটি জেলায় অসহায় দুস্তদের আইনি সেবা দিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে কোন ধারণাও নেই। নিজের অজ্ঞতায় তারা নিজের প্রাপ্য থেকে পর্যন্ত বঞ্চিত হচ্ছে।
আইন-আদালত সম্পর্কে মানুষের যে কিছু ভুল এবং ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে সেটি হয়ত বলার অপেক্ষা রাখেনা। আইন তাকেই সাহায্য করে যে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন। আইন কোন ব্যাক্তি বা বস্তু নয়। আইন তৈরি হয়েছে মানুষের জন্য যা কখনো দেখা বা পরখ করা যাবেনা, শুধু প্রয়োগ করা ব্যতীত।
সর্বোপরি কিছু ছন্দ দিয়ে লেখার ইতি টানলামঃ
“সভ্য মানুষ সভ্য জাতি, সভ্য হবে দেশ
যদি মোদের জানা থাকে আইনের রেশ,
অজ্ঞতায় নিজ অধিকার কর যদি শেষ
লুটে তোমায় অন্যজন রইবে সুখে বেশ।
অন্যের বৈঠা দিয়ে কেন চলে তোমার নাও
নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে রাস্তা বুঝে যাও,
অপরজনে করবেনা যে তোমার জন্য কাজ
তাই তোমায় নিজ জ্ঞানে বুঝতে হবে আজ।
আইন তোমার বন্ধু হবে আদালতে হবে যুদ্ধ
আইনজীবী তোমার পক্ষে লড়বে শুধু নিরস্ত্র,
সত্যের পথে লড়াই তাই হওয়া যাবেনা ক্ষুব্ধ
মিথ্যাবাদীর রক্ষা নেই তাই হতেই হবে পরাস্ত।
সত্য জানলে সত্য মানলে ভ্রান্ত থেকে মুক্তি
আইন কখনো বুঝবেনা কোন ভুলভাল যুক্তি,
মানুষ আমি সৃষ্টি সেরা আইনকে করি সম্মান
আইনের জ্ঞান বন্ধু হলে থাকবে আমার মান।”
লেখক, মুবিন হাসান খান অয়ন।
সদস্যঃ Progressive Lawyers Union of Shariatpur [PLUS]

লেখক পরিচিতি

Responses