বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ || ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ || ১৫ই সফর, ১৪৪২ হিজরি

করোনাকালে  বিচার লাভের অধিকার : আইন ও বাস্তবতা 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
বিগত ৮ মার্চ ২০২০ এ করোনা শনাক্তের পর থেকে দেশব্যাপী  ১৭ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা  হয়। ২৫ মার্চ ২০২০ থেকে সুপ্রিম কোর্ট সব ধরনের আদালতের জন্য ছুটি ঘোষণা করে৷ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটককৃত ব্যক্তিকে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার বিধান থাকায় প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অন্তত একজন করে ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থেকে উক্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রতিপালন করে আসছিলেন।
ভার্চ্যুয়াল আদালত কার্যক্রম শুরু করে নিম্ন আদালতে  হাজতে থাকা আসামীর জামিন ও রিমান্ড শুনানি এবং তামাদির জটিলতা নিরসনে কতিপয় বিশেষ ফৌজদারি আইনের অধীনে মামলা রুজু ও আপিল দায়েরের প্র‍্যাকটিস ডিরেকশন দেয়া হয়৷ পরবর্তীতে সরাসরি আদালতে গিয়ে ফৌজদারি মামলায় আত্মসমর্পণ, আপিল দায়ের,দেওয়ানি মামলা ও আপিল রুজুর   সুযোগ দিয়ে নির্দেশনা দেয়া হলেও সুপ্রিম কোর্ট এর ফুলকোর্ট সভায় অফলাইনে আদালত পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যদিও সুপ্রিম কোর্ট বার সহ প্রায় সব বার এসোসিয়েশন থেকে আদালত চালুর দাবি জানানো হয়৷
ইতিমধ্যে ৭ জুলাই ২০২০ মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘ আদালত কর্তৃক  তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার বিল ২০২০ ‘ পাশ করা হয়।
 আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ষান্মাসিক ( জানুয়ারি ২০২০ – জুন ২০২০)  প্রতিবেদন অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে ৬০১ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন, ৩৭ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, ১২৬ জন নারী ধর্ষণচেষ্টার শিকার এবং ৭ জন নারী ধর্ষণজনিত ট্রমায় আত্মহত্যা করেছেন।
একই সংগঠন এর ভাষ্যমতে, এই সময়ে ১৫৬ জন গণমাধ্যম কর্মী নিপীড়নের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৩০ জন ভিকটিমকে নিপীড়ন করার অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের প্রতি এবং ১৫ জন ভিকটিমদের ক্ষেত্রে অভিযোগের আঙুল ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের দিকে।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা  ও রাজনৈতিক চাপের অপসংস্কৃতির কারণে আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও অনেক সময় স্থানীয় থানায় অভিযোগ নেয়া হয় না।  কিছু ক্ষেত্রে থানার অসাধু কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে  দন্ডবিধির  লঘুতর ধারায় এজাহার রেকর্ড করার প্রবণতা থাকায় ভিক্টিম ফৌজদারি আদালতে অভিযোগ দায়ের করতেই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বোধ করেন৷ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ ধারায় দায়িত্বশীল ম্যাজিস্ট্রেট সরাসরি আমলে নেয়ার সুযোগ থাকায় দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া সহজতর হয়। একইভাবে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ পেলে একই ক্ষমতাবলে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অভিযোগখানা থানায় এজাহার হিসেবে রেকর্ডের আদেশ ও দেয়া হয়ে থাকে।
জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রেও জেলা ও নির্বাহী  ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ও ১৪৫ ধারায় প্রতিকার দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
এরকম পরিস্থিতিতে ২৫ মার্চ হতে ১০ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত নিম্ন আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা সংক্রান্তে কোন নির্দেশনা প্রদান করা হয় নি। যার মানে হল ২৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন নি৷  ফলে ভুক্তভোগীরা অপরাধের ভিক্টিম হওয়ার পাশাপাশি  বিচারহীনতার ও শিকার হচ্ছেন যা হয়তো একসময় বিচার বিভাগের প্রতি আস্থাহীনতায় রূপ নিতে পারে।
অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ বলে আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। কিন্তু ভার্চুয়াল কিংবা একচুয়াল দুই ধরনের আদালতের দ্বার ভিকটিমদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। একসময় আদালতের দ্বার উন্মুক্ত হলেও আলামত সংরক্ষিত না থাকায় ও ইতিমধ্যে সাক্ষীদের প্রভাবিত করার অবারিত সুযোগ থাকায় ভিকটিমদের ন্যায়বিচার পাওয়া অনেকাংশেই অসম্ভব হয়ে পড়বে৷
এইরূপ পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়মিত আদালত কার্যক্রম চালু করে কিংবা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের সুযোগ করে দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সময়ের প্রয়োজন।
আবু জাফর
আইনজীবী
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
mailatabuzafar@gmail. Com

লেখক পরিচিতি

Responses