Home » দৈনন্দিন জীবনে আইন » পিতা মাতার ভরণপোষণ ও বাস্তবতা
Adv. Anwarul Hakim, Law Officer, Agrani Bank Ltd.

পিতা মাতার ভরণপোষণ ও বাস্তবতা

প্রত্যেক সন্তান পৃথিবীর আলোয় আলোকিত হয় কেবল তাদের পিতা মাতার অন্যতম ফসল হিসেবে।

বিবাহ হচ্ছে একটি দেওয়ানি চুক্তি ও পবিত্র ইবাদত। যা পৃথিবী সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে স্বীকৃত। যে
বিবাহের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় সন্তানের সাথে বাবার পিতৃত্বের সম্পর্ক। আর মায়ের সাথে মাতৃত্বের
সম্পর্ক। বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যখন পিতামাতার বৈধ সম্পর্ক চলমান থাকে তখনই প্রকৃতির নিয়মে
মায়ের কোল জুড়ে আসে ফুটফুটে সন্তান। যাকে কেন্দ্র করে মা-বাবার সামনে পথচলা। বাল্যকাল হতে
মা ও বাবা স্বপ্ন দেখে সন্তান বড় হয়ে একদিন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, বিচারক ইত্যাদি হয়ে
মাতৃভূমি ও মা-বাবার সেবায় নিজেকে সঁপে দিবে। এভাবে চলে মা-বাবার সন্তানের স্বপ্ন পূরনের
পথচলা। সন্তান এইচএসসি’র গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় স্বপ্নের ক্যাম্পাসে। সেখানে রঙিন স্বপ্নে কেউ
কেউ ভুলে যায় তার অতীত। খুঁজে পায় মা-বাবাকে ছেড়ে নতুন ঠিকানা। এদিকে ছেলে কে মানুষের
মত মানুষ করতে গিয়ে বাবা ও মা হয়ে পড়ে বয়সের কাছে অসহায়, এটি প্রকৃতির নিয়ম। কোন
কোন বৃদ্ধ মা-বাবার স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এমন সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবা চাইলে আইনি প্রতিকার
পেতে পারে। আসুন দেখে নিই, আইন কি বলে……..

বাংলাদেশে সন্তান কর্তৃক পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে পিতামাতার ভরণপোষণ
আইন ২০১৩ নামে একটি আইন প্রচলন আছে। উক্ত আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে
পিতা ও মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে, এমন নির্দেশনা আছে। এখানে ভরণপোষণ বলতে
খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা এবং সঙ্গ প্রদানকে বুঝায়। পিতামাতার
অনুপস্থিতিতে ৪ ধারা অনুযায়ী দাদা-দাদী বা নানা-নানি কে ভরণপোষণ করার বাধ্যবাধকতা আছে।
যদি সন্তান কর্তৃক বর্ণিত ব্যক্তিগণকে ভরণপোষণ প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে মর্মে পরিগনিত হয় সেক্ষেত্রে
তিনি ৫ ধারা অনুযায়ী বর্ণিত আইনে অপরাধ করেছে মর্মে পরিগনিত হবে। উক্ত অপরাধের জন্য ১
লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারদণ্ডে দণ্ডিত হবে। উক্ত
অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার আছে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট (ধারা
৭)। অবশ্যই সংক্ষুব্ধ পিতা মাতাকে সংশ্লিষ্ট আদালতে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এই
আইনের অধীনে সংগঠিত অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোসযোগ্য। আদালত উপযুক্ত
মনে করলে মামলাটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা সিটি
কর্পোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলর বা উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট আপোসের জন্য পাঠাতে পারে।

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ কার্যকর হওয়ার পূর্বে ভরণপোষণের জন্য যে কেউ
পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারত। কেননা জামিলা খাতুন বনাম রুস্তম আলী
মামলায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বর্তমানে পিতামাতার ভরণপোষণের ব্যর্থতায় কেবল ম্যাজিস্ট্রেট
আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে। পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ কার্যকর হওয়ার পর
থেকে পিতা মাতাকে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে নির্যাতনকারী কতিপয় সন্তানকে এই
আইনের আওতায় আসায় বৃদ্ধ পিতামাতা বর্তমানে তাঁর সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনীদের সাথে সুন্দর
দিন অতিবাহিত করার সুযোগ পাচ্ছে। ফিরে পেয়েছে সেই সোনালি দিন, সোনালি অতীত। এখন যে
কেউ অসহায় পিতামাতা তার নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করতে
পারে। রাষ্ট্রকে অশেষ ধন্যবাদ এমন যথোপযোগী আইন প্রণয়ন করার জন্য।

আনোয়ারুল হাকিম আরাফাত
আইন কর্মকর্তা

অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড
এবং
অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।

ইমেইল: adv.anwardu@gmail.com

Share and Enjoy !

0Shares
0 0 0

About ডেস্ক রিপোর্ট

Check Also

বিভিন্ন স্থানে দেড় শতাধিক আইনজীবী করোনায় আক্রান্ত

ডেস্ক রিপোর্ট: সারাদেশে আইনজীবীরাও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত আক্রান্তদের সঠিক পরিসংখ্যান জানা না …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.