সড়ক পরিবহন আইন(২০১৮) এবং দুই চাকার ছোট্ট বাহন মটরসাইকেল নিয়ে কিছু কথা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। গতবছরের ২২ অক্টোবর আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট জারি করেছেন সরকার। ২০১৯ সালের কিছু মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনা এবং সার্বিক পরিস্থিকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন আইনটির কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন আইনে মটরযান এবং মটরযান চালকের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। যার মধ্যে শাস্তিস্বরুপ জরিমানা এবং কারাদন্ড অনেক বাড়ানো হয়।
গতবছর এই আইনটির বিরোধিতা করে বেশ কিছু যানবাহন শ্রমিক। কারণ উক্ত আইনে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন আসে যার ফলে শ্রমিকদের গতানুগতিক প্রথায় গণপরিবহণ চালানো অনেকটা দুঃষ্কর হয়ে উঠে। তাছাড়া শাস্তির বিধান বাড়ানোর ফলে অনেক শ্রমিকই আতঙ্কে পড়ে যায়। শ্রমিকদের পাশাপাশি মটরযান মালিকদের যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হচ্ছে, অধিকাংশ মটরযান ই ফিটনেসবিহীন এবং ঝুকিপূর্ণ। অধিক মুনাফার আশায় এসব যানবাহন ঝুকিপূর্ণ হওয়া স্বত্তেও কিছু অসাধু মালিকপক্ষ তা রাস্তায় নামায়, যার ফলে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে সড়ক দুর্ঘটনা।
নতুন এই আইনের প্রয়োগের ফলে গণপরিবহণ মালিক-চালক এবং কন্ডাক্টর দের চিন্তার কারণ নানাবিধ হলেও মানুষের জীবনের ঝুকি কমাতে এই আইন প্রয়োগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই আইন যথাযথ প্রয়োগ হলে বাংলাদেশে সড়ক দূর্ঘটনার হার অনেকাংশেই কমে যাবে বলে জনগন আশাবাদী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সড়ক দূর্ঘটনার জন্য সর্বাধিক কারণ হিসেবে রয়েছে গণপরিবহণগুলো বেপরয়াভাবে চালানো।
সড়ক পরিবহন আইন এর কার্যকারিতা ও গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে থাকলে হয়ত অনেক কিছুই লিখা যাবে। তাই এবার একটু এই আইনে উল্লেখিত এমন এক বিষয় নিয়ে কথা বলি যা হয়ত এতকিছুর ভীড়ে হয়ত কখনো আলোচনাতেই আসতে পারেনি।
সড়ক পরিবহন আইন(২০১৮) এর ধারাঃ ২(৪২) অনুযায়ী মোটরযান অর্থ কোনো যন্ত্রচালিত যানবাহন বা পরিবহণযান যাহা সড়ক, মহাসড়ক বা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত, নির্মাণ বা অভিযোজন করা হয় এবং যাহার চালিকাশক্তি অন্য কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উৎস হইতে সরবরাহ হইয়া থাকে, এবং কোনো কাঠামো বা বডি সংযুক্ত হয় নাই এইরূপ চ্যাসিস ও ট্রেইলারও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে, তবে সংস্থাপিত বা সংযুক্ত রেলের উপর দিয়া চলাচলকারী অথবা একচ্ছত্রভাবে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান বা কারখানা বা অন্য কোনো নিজস্ব চত্বরে বা অঙ্গনে ব্যবহৃত যানবাহন অথবা মনুষ্য বা পশু দ্বারা চালিত যানবাহন ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে না;
সড়ক পরিবহন আইন (২০১৮) তে সাধারণত মটরযান এর উপর বিশেষভাবে জোড় প্রয়োগ করেছে। মটরযান এর কথা উঠলেই আমরা সাধারণত গণপরিবহণ কিংবা বাস/ট্রাক কেই বুঝে থাকি। কারণ সাম্প্রতিক আলোচ্চ সড়ক দূর্ঘটনাগুলো মূলত  বাস এবং ট্রাক সম্পর্কিত। কিন্তু এসব যানবাহন ছাড়াও এই আইনে উল্লিখিত মটরযানগুলো হচ্ছেঃ আর্টিকুলেটেড মটরযান, এক্সপ্রেস ক্যারিজ, এক্সেল, কন্ট্রাক্ট ক্যারিজ, ট্যাক্সিক্যব,ট্রেইলর, প্রাইম মুভার, বাস, ভারী মটরযান, মধ্যম মটরযান, মাইক্রোবাস, সেমি-ট্রেইলর, হালকা মটরযান ও মটরসাইকেল।
উক্ত আইনে উল্লেখিত যানবাহণগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ছোট ও জনপ্রিয় মটরযান হচ্ছে “মোটরসাইকেল”। উক্ত আইনের ধারাঃ২ (৪৬) অনুযায়ী “মোটর সাইকেল” অর্থ দুই চাকা বিশিষ্ট মোটরযান;
উক্ত আইনে সকল মোটরযানের ক্ষেত্রেই শাস্তির তালিকা একি। তবে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দিকে শাস্তির বিধান একটু আলাদা। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দিকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে হেলমেটের দিকে। হেলমেট না পড়লে শাস্তিস্বরূপ গুণতে হবে ২০০-১০,০০০ টাকা পর্যন্ত। মোটরসাইকেল এর ক্ষেত্রে এছাড়া ভিন্ন তেমন কিছু নেই। অন্যান্ন মোটরযানের ক্ষেত্রে যেসব আইন, মোটরসাইকেল এর ক্ষেত্রেও সেসব আইন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সড়ক চলাচলে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে যে মোটরযানটি তা হচ্ছে মোটরসাইকেল। নিজ বাহনে থাকা মোটরসাইকেল চালককে মাঝে-মধ্যেই নিজের নিরাপত্তার ঝুকিতে পড়তে হয়। সাধারণ আকারে ছোট হওয়ায় এবং দুই চাকা বিশিষ্ট হওয়ায় এটিকে ব্যালেন্স করাও একটু কঠিন, এবং ছোটখাট রাস্তা থেকে শুরু করে বড় রাস্তা কিংবা হাইওয়েতেও এর ঝুকি অনেক। সড়ক পরিবহন আইন(২০১৮) এ উল্লেখিত অন্য সকল পরিচিত যানবাহন থেকে মোটরসাইকেল একটু ভিন্ন। দেখা যায় একটা ভাঙা রাস্তায় অন্য কোন ৩ বা ৪ চাকায় চলিত মোটরযান নিয়ন্ত্রণ যতটা না কঠিন তার চেয়ে বেশি কঠিন মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রন। তাছাড়া যাতায়াতকারী জনগন অজ্ঞতাবশত রাস্তায় অনেক সময় ইটের কণা,চিপ্সের প্যাকেট কিংবা পানির বোতল ফেলে রাখে। যার ফলে অন্যান্ন মোটরযান ২ চাকার অধিক হওয়ায় রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিসগুলোর উপর দিয়ে গেলে যতটা না সহজে নিয়ন্ত্রন করতে পারে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়।
সড়ক পরিবহন আইন(২০১৮) এর এখন হয়ত করোনাকালীন সময়ের জন্য খুব একটা প্রয়োগ হচ্ছেনা। কিন্তু এই করোনাকালীন সময়ে লকডাউনের প্রথম মাসে সড়কে যানবাহনের পরিমান অনেক কম থাকা স্বত্তেও প্রায় ২০০ এর অধিক সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরি সড়ক দূর্ঘটনার ফলে বিশাল পরিমাণে একটা মৃত্যুর হার দাড়ায়, যা হয়ত বছর শেষে দেখা যাবে করোনার মৃত্যুহারের চেয়ে বিগত বছরগুলোতে  সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেশি।
সড়ক দূর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশে সর্বাধিক মৃত্যুর প্রথম কারণ গণপরিবহন। কারণ একটি গণপরিবহন মানে কয়েকটি জীবন। আর একটি গণপরিবহণ যদি হয় বাস, সেক্ষেত্রে প্রায় অর্ধশতাধিক জীবন। পরবর্তীতে যে সাধারণ পথচারীদের জীবননাশ এর কারণ হয়ে থাকে অনিরাপদ পারাপার যারফলে পত্রিকা খুললে প্রায়ই হেডলাইনে দেখা যায় “বাস/ট্রাকের চাপায় পথচারী নিহত।” তারপর যে মোটরযানটি সড়ক দূর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ায় সেটি হচ্ছে মোটরসাইকেল।
মোটরসাইকেল আকারে ছোট হওয়ায় এটি সাধারণ দূর্ঘনটার সংখ্যা বাড়ানোর কারণ হলেও, নিহতের পরিমান বাড়ার কারণ একটু ভিন্ন। কারণ একটি বাস,ট্রাক কিংবা প্রাইভেট কারের ওজন/আয়তন একটি মোটরসাইকেলের তুলনায় অনেক বেশি। যারফলে একটি মোটরসাইকেল একসিডেন্ট হলে শুধু মোটরসাইকেল চালকের কিংবা আরোহীর জীবন হুমকির মুখে দাড়ায়। আরেকটি বিষয় হল, যদি একটি মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয় কোন ভাড়ী মোটরযান (যেমনঃ ট্রাক/বাস/প্রাইভেট)  ইত্যাদির সঙ্গে সেক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালক এবং আরোহীর যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
কিছু কিছু অপরাধ যেমনঃ
[ ধারা-৯০ঃ যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৪৭ এর বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহা হইলে উক্ত লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক অনধিক ৫ (পাঁচ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত হিসাবে দোষসূচক ১ (এক) পয়েন্ট কর্তন হইবে।
ধারা-৯১ঃ যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৪৮ এর বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহা হইলে উক্ত লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ১ (এক) মাসের কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত হিসাবে দোষসূচক ১ (এক) পয়েন্ট কর্তন হইবে।
ধারা-৮৪ঃ যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ৪০ এর বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহা হইলে উক্ত লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসরের কারাদণ্ড তবে অন্যূন ১ (এক) বছর, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
ধারা-৯৮ঃ ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের দণ্ডঃ
যদি নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয়, তাহা হইলে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক বা কন্ডাক্টর বা সহায়তাকারী ব্যক্তির অনুরূপ মোটরযান চালনা হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক ০৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে প্রদানের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।  ]
উক্ত অপরাধগুলোর সাজা আইনে উল্লিখিত সব মোটরযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে পাঠকদের কাছে আমার একটি ব্যাক্তিগত প্রশ্ন রইল।
উপরোক্ত বিধান গুলো যদি লঙ্ঘন করা হয় তবে সকল মোটরযান চালক কি আদৌ সমানভাবে দণ্ডিত হবে নাকি মোটরযানের বর্ণনানুযায়ী ?
এর উত্তর হয়ত “সকল মোটরযান” হতে পারে। তবে যেহেতু প্রত্যেকটা বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শাস্তি থেকে সর্বোচ্চ শাস্তির পরিমাণ দেয়া আছে, তাহলে অবশ্যই মোটরযানভেদে সাজার পরিমান নির্ধারিত হবে। কারণ উপরে উল্লেখিত শাস্তির ধারাগুলো একিসাথে একটি দুই চাকার ছোট মোটর সাইকেল ও করতে পারে এবং একিসাথে ভারী যানবাহন বা বাস/ট্রাক ও করতে পারে। তবে যেকোন ক্ষেত্রেই পথচারী কিংবা গণপরিবহনের যাত্রী; দূর্ঘটনার কবলে পড়লে বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু ভারী যানবাহনের দ্বারাই।
যেমনঃ মোটরযানের মধ্যে পার্থক্যতা ভেদে শাস্তির কারণ হিসেবে আরেকটি যৌক্তিকতা হচ্ছে যানবাহনে সিসি লিমিট। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি মোটরসাইকেলের সিসি লিমিট সর্বোচ্চ ১৬৬ সিসি, অপরদিকে প্রাইভেট কারসহ কিছু মোটরযানের ক্ষেত্রে সিসি লিমিট নেই বললেই চলে।  আমি ব্যাক্তিগতভাবে লক্ষ করেছি, হাইওয়েতে মোটর সাইকেল চালানোর সময়, প্রায় বাস কিংবা প্রাইভেট কারের দ্রুত গতিতে চালানোর জন্য বিপজ্জনক অবস্থার স্বীকার হতে হয়। কারণ একটি প্রাইভেট কার কিংবা বাসের ইঞ্জিন পাওয়ার ও সিসি মোটরসাইকেলের তুলনায় বেশি  হওয়ায় খুব দ্রুত চলে। যারফলে মোটরসাইকেল হালকা একটি বাহন হওয়ায় হাইওয়েতে ভারী মোটরযানের গতি ও উচ্চতার কারণে দানবের মত মনে হয় ও ঝুকির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এই আইনের অন্তর্ভুক্ত প্রত্যেকটি মোটরযানের ক্ষেত্রেই বিধান এক। সেক্ষেত্রে যদি ধারাঃ৯৮ এর প্রসঙ্গ তোলা হয় তবে গতি ও ওভারলোডের ক্ষেত্রে একটি মোটরসাইকেলের তুলনায় অন্যান্ন মোটরযান কি বেশি দায়ী হবস? ঠিক একিভাবে যদি কোন মোটসাইকেল চালক পার্কিং এর ক্ষেত্রেও কোন ভুল করে ফেলে তবে ধারাঃ৯০ অনুযায়ী শাস্তি পাবে। তবে একটি বাস বা ট্রাকের ভুল পার্কিং এবং একটি মোটরসাইকেলের ভুল পার্কিং এর মধ্যে নিঃসন্দেহেই অনেক তফাৎ রয়েছে। তাই নয় কি?
আবার যদি আমরা এই আইনের ধারা ৪০ এর (১),(২),(৩) এর দিকে নজর দেই তাহলেও দেখতে পাব যেসব কারিগরি জিনিস পরিবর্তন করা যাবেনা সেসবের প্রায় বেশিরভাগ জিনিস ই মোটরবাইকে নেই। তবে ধারাঃ৪০ এর (৪) ও (৫) অনুযায়ী কোন কারিগরি পরিবর্তন কিংবা মোটরযানের রং পরিবর্তন করতে হলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে অনুমোদন করতে হবে।  কিন্তু একটা মোটরসাইকেলে তেমন কোন পরিবর্তন করাও যায়না। মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন পেপার/ডিজিটাল কার্ড অথবা ট্যাক্স টোকেন অনুযায়ী মটরসাইকেলের বর্ণনা হিসেবে কারিগরি দিকগুলো সাধারণত উল্লেখিত থাকেঃ টায়ার সংখ্যা, ওজন,বোঝাই ওজন,সিলিন্ডার সংখ্যা,রং, টায়ার সাইজ, দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ।
আমাদের দেশের অনেক তরুনরাই তাদের পুরাতন মোটরসাইকেলগুলিকে মোডিফাইয়ের মাধ্যমে আরো আকর্ষণীয় করছে, যার ফলে তারা সচরাচর মোটরযানের কাগজের সাথে মিল রেখে নতুন নিজেদের মত কিছু পার্টস এর পরিবর্তন করছে,যা মোটরসাইকেলের স্টক পার্টস কিংবা অংশ বিশেষ হতে আলাদা। যদিও এর ফলে কারিগরি অভ্যান্তরিন কোন পরিবর্তন হয়না তবে বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন আসে, যা হয়ত মোটরসাইকেলটির কাগজের সাথে মিললেও কোম্পানী থেকে ক্রয় করা বাহনটির সাথে মিলেনা। যার ফলে অনেক সার্জেন্ট ৮৪ ধারায় মামলা দিয়ে থাকেন।
কিন্তু যেসব বিষয় পরিবর্তন ফলে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কাগজের সাথে কোন অমিল থাকেনা, এবং যা পরিবেশ কিংবা সড়কের জন্য ক্ষতিকর নয় তবে সেসব পরিবর্তনের ফলে একটি মোটরসাইকেল বা ক্ষুদ্র একটি মোটরযান কতটুক শাস্তি পেতে পারে? যদিও মোটরসাইকেল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাক্তিগত ব্যবহারে চালানোর জন্য এবং এই যানের দ্বারা অন্য কোন মোটরযানের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবি কম। অপরদিকে অন্নান্য মোটরযানের সাথে হাইওয়ে কিংবা প্রধান সড়কে চলতে হলে এই বাহনটিকেও অন্নান্য মোটরযানের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সেক্ষেত্রে মাঝে-মধ্যে কারিগরি কিছু বিষয়ে হস্তক্ষেপ একেবারেই না করলে নয়।
যেমনঃ ফগ লাইট,ভালো ব্রেকিং এর জন্য কিছু ক্ষেত্রে স্টক টায়ার পরিবর্তন, প্রদত্ত হর্ণের ক্ষেত্রেও অনেক মোটরসাইকেলের হর্ণ পরিবর্তন করে অধিক শব্দের হর্ণ ব্যাবহার, নিজের ব্যাবহারের এবং আরামের সার্থে অনেকসময় কিছু মোটরসাইকেলের অপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস খুলে রাখা এবং সর্বশেষ পুরাতন মোটরসাইকেলগুলোকে আপডেট করতে কিছু জিনিস এনালগ সিস্টেম থেকে ডিজিটালে আনতে কিছু কারিগরি পরিবর্তন করা হয়। অন্যথায় সড়কে এইসব মোটরসাইকেলগুলি অন্নান্য মোটরযানের সাথে পেরে উঠেনা। তবে সমস্যার ব্যাপারটি অচ্ছে এইসব পরিবর্তন একটি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রভাব না ফেললেও বড় একটা প্রভাব ফেলে গণপরিবহনগুলোতে। কিছু অসৎ বাস/ট্রাক মালিক অতিরিক্ত আয়ে আশায় এবং মোটরযানে অধিক পরিমানে যাত্রী/পণ্যের আশায় তাদের পুরাতন মোটরযানের কারিগরি দিকগুলি পরিবর্তন করছে। এবং কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, অবৈধ মোটরযান এবং ভুয়া কাগজ বানিয়ে সড়কে চালানোর জন্যও এসব পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও মোটরসাইকেল এমন কিছু সড়কে চলে যেখানে রিক্সা,অটো রিক্সা,ভ্যান,নসিমনের মত অনেক বৈধ ও অবৈধ যানবাহন চলাচল করে যেসব যানবাহন সড়ক পরিবহন আইন(২০১৮) এ উল্লেখিত নেই। তাই মোটরসাইকেল এমন এক মোটরযান যার উল্লেখ আইনে থাকলেও এটিকে প্রায় সব যানবাহনের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বপ্রকার সড়কেই চলতে হয়। তাই এই আইনে উল্লেখিত কিছু বিধানের ক্ষেত্রে সার্বিক বিবেচনায় এই বাহনটি যদি কোন বিধান লঙ্ঘন করে তবে যেন সর্বনিম্ন শাস্তি প্রদান করা হয়।
সাধারণত মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করে থাকেন ধারাঃ১২০ অনুযায়ী অর্পিত কোন সাব-ইন্সপেক্টর কিংবা সার্জেন্ট। তাই সাধারণভাবেই উক্ত বিষয়গুলি তদারকির ক্ষমতাও তার হাতে ন্যাস্ত। অন্নান্য মোটরযানের তুলনায় প্রায় সব যায়গাতেই মোটরযানের উপর নজরদারী বেশি রাখা হয়। যার ফলে এই ছোট্ট বাহনটির চালককেও দুইদিক দিয়ে থাকতে হয় সচেতন। মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে সচেতন এবং বৈধতা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগনপত্রের সচেতনতা। আবার যদি কেউ ড্রাইভিং এর সুবিধার্থে মোটরসাইকেলের কিছু  দরকারি পরিবর্তন করে সে বিষয়েও থাকতে হয় আতঙ্কে। তাই সকল বিষয়গুলো বিবেচনা করে পথিমধ্যে সিগনহাল দেয়া পরিদর্শক চাইলে হয়ত কিছুটা ছাড় দিতে পারেন। কারণ একজন মোটরসাইকেল চালকের মানসিক অবস্থা সর্বক্ষেত্রে স্থির থাকা সম্ভব নয়। কারণ মোটরসাইকেলটি হাইওয়েতে যখন চলতে থাকে তখন আকারে ছোট হওয়ার এটিকে এক প্রকার আতঙ্ক নিয়েই চলতে হয়। অপরদিকে যখন সাধারণ সড়কে চলে সেখানেও ঝুকির মুখে থাকে। তাই যদি অন্যান্ন মোটরযানের সাথে তাল মিলিয়ে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও সমান শাস্তি দেয়া হয় তবে ব্যপারটায় যেন একটু অসামঞ্জস্য থেকেই যায়।
তেঁতো হলেই বাস্তব যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন তুলনামূলক প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় মোটরসাইকেল বেশি হয়ে গিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মোটরসাইকেলের দিকে বেশি আকৃষ্টতা হয়ত এর কারণ। অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাপ্ত বয়স্ক বেশিরভাগ কিশোরকেই কোন প্রকার নিরাপত্তা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়। অপরদিকে রয়েছে দ্রুতগতির কিছু চালক। যার ফলাফল হিসেবে দেখা যায় সড়কে মৃত্যুর ঘটনাগুলো।
আইন সকলক্ষেত্রে এবং সবার ক্ষেত্রেই সমান। তাই প্রত্যেক মোটরযান চালকদের উচিত হবে আইন মেনে নিজের সতর্কতার নিশ্চয়তা নিয়ে তবেই মোটরযানটি নিয়ে সড়কে বের হওয়া। এবং মোটরসাইকেল একটু ব্যাতিক্রমি মোটরযান হওয়ায় এই ব্যাপারে চালক/পরিদর্শক/সার্জেন্ট সহ সকলকেই বিশেষ নজরদারিতার জন্য অনুরোধ রইল। কারণ যানবাহন ছোট হোক কিংবা বড়, অসচেতনতাই হতে পারে মৃত্যুর কারণ।

লেখক পরিচিতি

Responses