মঙ্গলবার, ২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ || ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ || ১৪ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

ভারচুয়াল কোর্টঃ বারের ভূমিকা 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

বাংলাদেশে বিগত ০৮/০৩/২০২০ ইং থেকে আজ পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্তের যে গ্রাফ, তা ক্রমাগত উপরের দিকে উঠছে। বিশেষ করে ২৮/০৪/২০২০ইং থেকে প্রতিদিন শনাক্তের হার মিনিমাম ৫০০ জন করে থাকছে এবং সম্প্রতি ১৩/০৫/২০২০ ইং থেকে সেটা হাজার অতিক্রম করেছে। অতএব, এটা সহজেই অনুমেয় যে ঈদের আগে-পরে এই গ্রাফ আকাশমুখী হবে। অনেকেই আশা করছেন কিংবা মনে করছেন যে মাহে রমজানের পর অফিস-আদালত আগের মত খুলে দেয়া হবে কিংবা চলবে । সেরকম কিছু হলে নির্দিধায় বলা যায় আমেরিকা থেকেও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে এই বাংলাদেশে। এ অবস্থায় যারা আশা করছেন বা বলার চেষ্টা করছেন যে ঈদের পর কোর্ট খুলে দেয়া দরকার, কোর্ট খুলে দিলে তারা শুধু নিজেরাই বিপদে পড়বেন না, সবচেয়ে বিপদে পড়বেন আমাদের বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীগন, যাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা তেমন ভালো না।

করোনার যখন এই মারাত্মক অবস্থা, তখন আমাদের কোর্ট সিস্টেমে সংযোজিত হয়েছে ভারচুয়াল কোর্ট। নতুন কোন সিস্টেম মানুষ সহজেই মেনে নিতে চায় না। তারপরও সময়ের প্রয়োজনে দ্রুত পজিটিভ কোন সিস্টেমের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়া জরুরী। এ অবস্থায় ভারচুয়াল আদালত হতে পারে চমৎকার বিকল্প, তাই আমরা যত দ্রুত ভারচুয়াল আদালতের সাথে অভ্যস্ত হব, ততই আমাদের লাভ। এ ব্যাপারে যদিও অনেক প্রশিক্ষণ কিংবা ইনফরমেশন ইতিমধ্যেই অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আছে, কিন্তু  এ ব্যাপারে আমাদের বারগুলোর ভূমিকা একেবারেই নেই বললেই চলে। প্রকৃত অর্থে, সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে শুরু করে আমাদের জেলা বারগুলো আইনজীবিদের মান উন্নয়নে খুব আশাব্যঞ্জক ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি কখনোই। এখন এই সময়ে এসে, সারা পৃথিবী যখন বিপদে আছে, তখন টিকে থাকার মুল মন্ত্রই হচ্ছে পরস্পর পরস্পরকে সহোযোগিতা এবং এখনই প্রকৃত সময় বারগুলোর কার্যকর ভূমিকা রাখার। সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে শুরু করে আমাদের জেলা বারগুলো যেসব ভূমিকা রাখতে পারে, সেগুলো হলঃ

১। বর্তমানে ভারচুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষন না থাকার কারনে ভারচুয়াল আদালতের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশংকা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে ভারচুয়াল আদালতের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করতে পারে বারগুলো। প্রত্যেক আইনজীবির কাছে প্রশিক্ষন ম্যানুয়াল পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে খুব বেশি কষ্ট হবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনের আগে পরে সব আইনজীবিদের ঠিকানায় যেভাবে শুভেচ্ছা বার্তা পৌছানো হয়, সেই পদ্ধতিতে ম্যানুয়াল পৌছানো যায়। ম্যানুয়াল পৌছানো ছাড়াও, অনলাইনে কিংবা অফলাইনে আইনজীবিদের ভারচুয়াল কোর্টের ব্যাপারে কিভাবে প্রশিক্ষন দেয়া যায়, সেটা বের করতে পারে বারগুলো।

২। ভারচুয়াল আদালতে মামলা করতে গিয়ে অনেকেই অনেক ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন, যেমনঃ কারো পিডিএফ ফাইল বড় হয়ে যাচ্ছে, কারো বেইল পিটিশন আপলোড হচ্ছে না। বারগুলোর পক্ষে এক বা একাধিক আইটি এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়ে হেল্পলাইন চালু করা যেতে পারে, যারা ফোনের মাধ্যমে কিংবা রিমোট ডেস্কটপ এর মত সফটওয়্যার দিয়ে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করে/বলে দিতে পারবেন।

৩।  ভারচুয়াল আদালতের দুইটি বড় সমস্যা হচ্ছে ওকালাতনামা এবং বেইল বন্ড, যেগুলো ডিজিটাল না হওয়ার কারনে আইনজীবিরা ভারচুয়াল আদালতের পূর্নাংগ সুবিধা পাচ্ছেন না। বারগুলো যদি ওকালতনামা এবং বেইল বন্ড ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নেয়, সেটা সবার জন্যেই ভালো হবে এবং ভারচুয়াল আদালতের উদ্দেশ্য সাধন হবে। অনলাইনে অনেক ওয়েবসাইট আছে, যেখানে ডিজিটাল সিগনেচার দেয়া এবং নেয়ার ব্যবস্থা আছে, সেভাবে বারের ওয়েবসাইট কিংবা কোন এপস ডেভেলপ করে, সেসব ওয়েবসাইট কিংবা এপস এর মাধ্যমে ডিজিটাল ওকালাতনামা সাবমিট করার ব্যবস্থা করতে পারে কিংবা বিকল্প কোণ পন্থায় এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারে।

৪। নিম্ন আদালতে ভারচুয়াল কোর্টে মামলা করতে গিয়ে অনেকেই একটা সমস্যায় পড়ছেন, সেটা হলো মামলা সাবমিট করার পর শুনানির তারিখ বা সময় পেতে দেড়ি হওয়া। খবর পাওয়া যাচ্ছে যে পেশকারের সাথে যোগাযোগ করলে এই সমস্যার কিছু সমাধান হয়। বারগুলো এ ব্যাপারে বেঞ্চের সাথে যোগাযোগ করে একটা সমাধান বের করতে পারে, যেন দূর্নীতির হাত থেকে ভারচুয়াল আদালতকে মুক্ত রাখা যায়।

৫। এছাড়া ভারচুয়াল আদালত শুধু নিম্ন কোর্টে জামিনে সীমাবদ্ধ না রেখে এর ক্ষেত্র আরো বাড়ানো খুবই প্রয়োজন এই মুহুর্তে। কেননা এই লকডাউন সিচুয়েশনের সুবিধা নিয়ে সারা দেশে অনেক জায়গায় জমি/বাড়ি/জায়গা দখল করার মত ঘটনা অনেক ঘটছে। অতএব, সিভিল মামলায় ভারচুয়াল আদালতের ক্ষেত্র প্রসারিত করা অনেক জরুরী এখন। সেই ব্যাপারে বার প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।

৬। মহামান্য সুপ্রীম কোর্টে ভারচুয়াল আদালতকে কাজে লাগিয়ে এখন অনেক মামলার চুড়ান্ত শুনানি করা সম্ভব। বছরের পর বছর অনেক মামলা শুনানির জন্যে পড়ে আছে, যেগুলোর শুনানি রেগুলার কোর্টে হাজার হাজার মামলার চাপে করা যায় না, সেগুলো এখন শুনানির ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট বার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৭। যতদিন পর্যন্ত করোনার বিস্তার বন্ধ না হয়, কিংবা প্রতিষেধক সহজলভ্য না হয়, ততদিন যেন আইনজীবিগন ভারচুয়াল আদালতকে কাজে লাগিয়ে সমাজের প্রতি তার যে দায়িত্ব সেটা পালন করতে পারে এবং নিজেরাও সারভাইব করতে পারে সেদিকে নজর রেখে বারগূলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

খন্দকার নাজমুল আহসান

এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

লেখক পরিচিতি

Responses