বৃহস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ || ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ || ১২ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের যৌক্তিকতা ও দন্ডবিধি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের যৌক্তিকতা ও দন্ডবিধি।
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
শিক্ষিত এবং তাদের প্রতিপালক সমাজের কাছে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড কথাটি পরিচিত নয় এমন কাউকে খুজেঁ পাওয়া যাবেনা। বর্তমান দেশ সহ বিশ্বের করোনা পরিস্থিতির অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির যেমন ব্যপক গণনা এবং উত্তরায়ণের পথ বাতলানোর কথা ভাবা হচ্ছে সে তুলনায় শিক্ষার মহাবিপর্য়ের ব্যপারে নেই সময়োপযোগী কোন উদ্যোগ। করোনার প্রাদুর্ভার থেকে শুরু করে এখনো সেই ডিজিটালাইজেশনের ট্যাগ লাগিয়ে চলছে অনভিজ্ঞ অনলাইন পাঠদান। অনভ্যস্ত কার্যপরিমন্ডলে সামিল হতে পারেনি দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থীরা, যদিও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের জরিপ মতে ৯৬% শিক্ষার্থীরা অনলাই পাঠদানের আওতায় রয়েছে কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্রাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তা ১২% ৷

তথাকথিত ডিস্টেন্স লার্নিং এর মতন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা করোনা কালের আগে থেকেই প্রচলিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কিন্তু বিষয়টি প্রাইমারি বা স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য নিতান্তই ঠাট্টার বিষয়। যদিও মার্চের কড়া লকডাউনে নিরুপায় পরিস্থিতিতে অনলাইন ভিত্তিক পাঠদান বেশ সুনামের দাবিদার, কিন্তু প্রায় বছর ঘুরতে যাওয়া একই পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার মতন মহান বিষয়ের অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য। বার্ষিক পরিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে প্রশ্নপত্র এবং উত্তর প্রদানের জন্য খাতা। যা সার্টিফিকেট প্রেমী বাঙালিদের সুযোগ তৈরি করেছে বাড়িতে শুয়ে-বসে নকল পাশের অগাধ সুযোগ যদিও ব্যতিক্রম রয়েছে অনেকেই।

এদিকে বিশ্বে সর্চচ্চ আক্রান্তের দেশ আমেরিকা সহ ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ইংল্যান্ড সবখানেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথাটি মাথায় রেখে। যদিও ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পরে সংক্রামণের হার বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় বন্ধ ঘোষণা করে আবারও উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে খোলা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো। এমনকি পাশ্ববর্তী দেশ ভারত বিশ্বে সংক্রামণের দ্বিতীয় সর্বচ্চ ধাপে পৌছে যাওয়ার পরেও ১৫ অক্টোবর থেকে সবধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়।

স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় বিশেষ করে বেসরকারি স্কুলগুলো সহ সদউদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলের শিক্ষকদের বেকারত্বের অনটন নিয়ে উঠে গেছে নাভিশ্বাস এখন তাদের মধ্যে চলছে আন্দোলনের প্রস্তুতি। কেননা অনেকে পেশা পরিবর্তন করে জীবিকা নির্বাহের পথ বাতলে নিতে পারলেও, অধিকাংশ রাষ্ট্রের কারিগর সকল শিক্ষকদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। কারণ যারাও বা প্রশাসনের নজরের আড়ালে কোচিং বা ব্যাচের মাধ্যমে পরিচালনা করতে গেছে শিক্ষাকার্যক্রম তাদের গুণতে হয়েছে জরিমানার টাকা এবং সইতে হয়েছে সামাজিক লাঞ্ছনা।

অতঃপর আশু শীতে করোনার সেকেন্ড ওয়েব নিয়ে একটা চিন্তা থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে মানা হচ্ছে না কোন সাবধানতা এখন করোনার প্রতিকি সাবধানী চিহ্ন সরূপ শুধু রয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অচল অবস্থা যার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। যে জাতির ভবিষ্যতদের নিয়ে এত সকল সাবধানী বন্ধ এবং কঠোরতা কিন্তু দমিয়ে রাখতে পারেনি সেই শিশু কিশোর কিংবা প্রাপ্তবয়ষ্কদের। তাদের অবাধ বিচরণ চোখে পরার মতন, করোনার ক্রমহ্রাষমান প্রাদুর্ভাব এবং মৃত্যুর হার নিয়ে নিশ্চিত হয়ে আসা পরিবার গুলোও তাই বাঁধা দিচ্ছে না বাড়ির বাহিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নেই মাক্স ব্যবহার সহ বার বার হাত ধোয়ার বালাই সবই যেন স্বাভাবিক এবং আগের মতন জীবন চলছে নিয়তিকে ভরসা করে।

কিন্তু আইনের রয়েছে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায়ের দিকনির্দেশনা। সকল পরিস্থিতি যার আওতাভুক্ত যেমন বর্তমার করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে ১৮৬০ সালের আইন দন্ডবিধি চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে জনস্বাস্থ্য জনিত অপরাধের সমাধান।

যেমন উল্লেখিত অধ্যায়ের ২৬৯ ধারায় বলা আছে-
কোন ব্যক্তি যদি বেআইনীভাবে বা অবহেলামূলকভাবে এমন কোন কার্য করে যা জীবন বিপন্নকারী মারাত্মক কোন রোগের সংক্রমণ ছড়াতে পারে, তা জানা সত্ত্বেও বা বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্বেও তা করে, তবে-সেই ব্যক্তি ছয়মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা অর্থ দণ্ডে, অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।অধিকন্তু,

২৭০ ধারার বর্ণনা অনুযায়ী –
কোন ব্যক্তি যদি এমন কোন বিদ্বেষমূলক কার্য করে, যা জীবন বিপন্নকারী মারাত্মক কোন রোগের সংক্রমণ বিস্তার করতে পারে, এবং সে কার্য করার দরুণ যে অনুরূপ রোগের সংক্রমণ বিস্তার হতে পারে তা জানা সত্ত্বেও বা বিশ্বাস করার কারণ সত্ত্বেও তা করে, তবে সে ব্যক্তি দুই বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থ দণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।এবং

২৭১ ধারায় বলা আছে –
কোন জাহাজ বা জলাযানের উপর কোয়ারেন্টাইন আরোপের জন্য অথবা যেসব জলযানের উপর কোয়ারেন্টাইন আরোপ করা হয়েছে, অপর কোন জাহাজের বা তীরভূমির সাথে তাদের সংযোগ সম্পর্কে, অথবা যেসব স্থানে সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ দেখা দিয়েছে, সে সব স্থানের সাথে অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ সম্পর্কে, সরকার দ্বারা প্রণীত ও জারীকৃত কোন বিধি বা নিয়ম কোন ব্যক্তি যদি জ্ঞাতসারে অমান্য করে, তবে সে ব্যক্তি ছয় মাস পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা অর্থ দণ্ডে, অথবা উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।তাই নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম যেমন অপরাধ ঠিক তেমনি, দিশেহারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের রোজকার করাও তাদের সাংবিধানিক অধিকার লজ্ঞন নিশ্চয়ই নাগরিক অধিকার লজ্ঞন। বিষয়টি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পূর্বে তার লাগাম টেনে ধরা এবং জাতি রাষ্ট্রের কারিগর শিক্ষকদের যেন উপার্জনের  মতন মৌলিক অধিকার আদায়ে আন্দোলনে নেমে রাষ্ট্রকে লাঞ্ছিত হতে না হয় এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যেন না হতে হয় শিক্ষাবঞ্চিত।

লেখকঃ-রাহুল কুমার,শিক্ষানবীশ আইনজীবী;জজ কোর্ট, সিরাজগঞ্জ।

লেখক পরিচিতি

Responses